
বৃন্দাবনের বিখ্যাত সন্ত প্রেমানন্দ মহারাজের শিষ্য দীপক লোধি ওরফে রসিক দুলারি শরণের মৃত্যু ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত। ২৫ সেপ্টেম্বর বারাহ ঘাট এলাকার গুরু কৃপা কুঞ্জ আশ্রমের চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে মারা যান দীপক। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর গোপনাঙ্গ কাটা অবস্থায় পাওয়া যায় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। যে ঘরে তিনি থাকতেন, সেখান থেকে রক্তমাখা একটি গ্রাইন্ডারও উদ্ধার হয়। ফলে দীপকের মৃত্যু নিছক আত্মহত্যা, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও ঘটনা রয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
ছাদ থেকে ঝাঁপ, সিসিটিভিতে কী দেখা গেল?
বৃন্দাবনের সিও সঞ্জীব কুমারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে। পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখেছে। সেখানে আশ্রমের উপরের তলা থেকে দীপককে ঝাঁপ দিতে দেখা গিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ পুলিশ খবর পায় যে এক ব্যক্তি আশ্রমের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরে দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, আশ্রম এবং তার আশপাশের এলাকার আরও সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দীপকের মোবাইল ফোন এবং ডায়েরিও পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। সেগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যৌনাঙ্গ কীভাবে কাটা হল, তদন্তে পুলিশ
ময়নাতদন্তে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে দীপকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে সেই রক্তক্ষরণ ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে হওয়া আঘাতের কারণে হয়েছিল, নাকি যৌনাঙ্গ কেটে যাওয়ার কারণেও অতিরিক্ত রক্তপাত হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ জানিয়েছে, দীপক যে ঘরে থাকতেন, সেখান থেকে একটি গ্রাইন্ডার পাওয়া গিয়েছে। সেটিতে রক্তের দাগ ছিল। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, গ্রাইন্ডার দিয়েই তাঁর যৌনাঙ্গ কাটা হয়ে থাকতে পারে। তবে তিনি নিজেই সেটি করেছিলেন, নাকি অন্য কেউ তাঁর যৌনাঙ্গ কেটেছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
বৃন্দাবনের সিও সঞ্জীব কুমার জানিয়েছেন, এই বিষয়টি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কেন এমন ঘটনা ঘটল, কীভাবে তাঁর যৌনাঙ্গ কাটা হল এবং এর সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনও যোগ রয়েছে কি না, সবটাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্য, আপাতত আত্মহত্যার সম্ভাবনাই সামনে এসেছে। কিন্তু যৌনাঙ্গ কাটা অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় তদন্তের সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই মুহূর্তে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
পরিবারের অভিযোগ কী
দীপকের পরিবারের পক্ষ থেকেও থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁর ভাই মণীশ প্যাটেলের অভিযোগ, তাঁরা আশ্রমে দীপকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু আশ্রমের লোকজন তাঁদের তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেননি। পরিবারের দাবি, দীর্ঘক্ষণ তাঁদের বাইরে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল।
মৃতের পরিবারের আরও অভিযোগ, গত প্রায় দু’বছর ধরে দীপকের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ খুবই কম ছিল। পরিবারের সদস্যরা বৃন্দাবনে এলেও তাঁদের অন্যত্র থাকতে হত এবং অল্প সময়ের জন্য দীপকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ মিলত বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
দীপকের বোনের স্বামী সোনু প্যাটেলের দাবি, ২০২৪ সাল থেকে দীপক প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এমনকী দীপকের নিজের কাছে মোবাইল ফোনও ছিল না বলে দাবি পরিবারের।
পরিবারের বক্তব্য, দীপক আত্মহত্যা করেছেন কি না বা তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, সে বিষয়ে তাঁদের এখনও স্পষ্ট কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি। সেই কারণেই তাঁরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন এবং গোটা ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন।
কীভাবে প্রেমানন্দ মহারাজের আশ্রমে এলেন দীপক
দীপক লোধি মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁর ধর্মীয় বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। বৃন্দাবনে আসার আগে তিনি নর্মদা পরিক্রমাও করেছিলেন।
প্রায় দু’বছর আগে জব্বলপুর থেকে বৃন্দাবনে আসেন দীপক। পরে প্রেমানন্দ মহারাজের কাছে দীক্ষা নিয়ে রসিক দুলারি শরণ নাম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি বারাহ ঘাট এলাকার ওই আশ্রমে থাকতে শুরু করেন।
পরিবার জানিয়েছে, গত বছর দীপকের মা বৃন্দাবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কয়েক দিন সেখানে থেকে দীপকের সঙ্গে মথুরা-বৃন্দাবন ঘুরেও দেখেছিলেন তিনি।
তদন্তে একাধিক প্রশ্ন
দীপকের মৃত্যু নিয়ে আপাতত পুলিশের সামনে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। সিসিটিভিতে ছাদ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার ছবি পাওয়া গেলেও তিনি কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, তা এখনও জানা যায়নি। একইসঙ্গে তাঁর যৌনাঙ্গ কীভাবে কাটা হল এবং ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া রক্তমাখা গ্রাইন্ডারের সঙ্গে ঘটনার কী সম্পর্ক, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক প্রমাণ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, মোবাইল ফোন এবং ডায়েরি-সহ সমস্ত তথ্য মিলিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দীপকের মৃত্যুকে ঘিরে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না পুলিশ।