
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এ ব্যাপক হারে ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দাখিল করলেন বিরোধী INDIA ব্লকের নেতারা। সোমবার লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে এই পিটিশন জমা দেওয়া হয়। পাশাপাশি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের উপর বিধিনিষেধ নিয়েও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিরোধী নেতারা।
এর আগে, SIR-এ কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি' করেন INDIA ব্লকের সাংসদ ও সমর্থকরা। সেই কর্মসূচির পর রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী নেতাদের হয়ে তাঁদের আইনি দল আদালতে আবেদন জমা দেয়। তবে পিটিশনে ঠিক কী কী নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে, তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
পিটিশনে ১১ জন বিরোধী নেতা
এই জনস্বার্থ মামলায় (PIL) আবেদনকারী হিসেবে রয়েছেন ১১ জন বিরোধী নেতা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃণমূল কংগ্রেস নেতা সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, আরজেডি নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব, শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) নেতা সঞ্জয় রাউত, সিপিআইএম নেতা এম এ বেবি, সিপিআই নেতা ডি রাজা, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার নেত্রী মহুয়া মাঝি, এনসিপি-এসসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের নেতা ইটি মহম্মদ বশির।
এই মামলায় চারটি পক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)। তবে মামলার শুনানি কবে হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনও সময়সীমা জানানো হয়নি।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করার আবেদন খারিজ
এর আগে লোকসভা ও রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা-সহ INDIA ব্লকের নেতারা প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই আবেদন মঞ্জুর হয়নি। প্রধান বিচারপতি জানিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্টে ইতিমধ্যেই বিচারাধীন বিষয় নিয়ে এ ধরনের বৈঠকে আলোচনা করা হলে ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতির সঙ্গে তার সংঘাত তৈরি হতে পারে।
কংগ্রেস নেতা তথা প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি জানান, পিটিশনে SIR প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের উপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা এই আইনি পদক্ষেপে সামিল হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করার উদ্যোগ নিয়ে বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিচারব্যবস্থার উপর চাপ তৈরির অভিযোগ উঠলেও তা খারিজ করেন সিংভি। তাঁর বক্তব্য, নেতারা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য চিঠি লিখেছিলেন। পরে পিটিশন দাখিল করার পরামর্শ পাওয়ায় তাঁরা আইনি পথেই এগিয়েছেন।
কোথায় থামানো হয় মিছিল?
রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গের নেতৃত্বে আয়োজিত 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি'-তে একাধিক বিরোধী দলের সাংসদ, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী-সমর্থক অংশ নেন। প্রথমে তাঁরা কনস্টিটিউশন ক্লাবে জড়ো হন। সেখান থেকে চারটি বাসে বারাখাম্বা রোডের মোড়ের দিকে যান। পরে পায়ে হেঁটে সুপ্রিম কোর্টের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ভগবান দাস রোডে ব্যারিকেড দিয়ে মিছিল আটকে দেয় দিল্লি পুলিশ। মিছিল থামিয়ে দেওয়ার পর রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদব-সহ কয়েক জন নেতা একটি গাড়ির উপরে উঠে পড়েন।
উল্লেখ্য, দিল্লিতে বিক্ষোভের জায়গা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১১ অক্টোবর দিল্লি পুলিশ একটি নির্দেশ জারি করে রামলীলা ময়দান, বুরাড়ি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির CBD গ্রাউন্ডকে বিক্ষোভের নির্দিষ্ট স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে। এর আগে যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
এই বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছে কংগ্রেস। দলের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশও বিক্ষোভকারীদের প্রতি প্রশাসনের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্রের পরিস্থিতি বোঝাতে ‘ডেমোকুর্সি’ শব্দটিও উঠে আসে।
'পদত্যাগ করুন, রাজসাক্ষী হন', জ্ঞানেশ কুমারকে বার্তা রাহুলের
এর আগে প্রধান বিচারপতি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আবেদন খারিজ করার পরই সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন রাহুল গান্ধী। কংগ্রেসের সদর দফতরে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করার এবং 'রাজসাক্ষী' হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। রাহুলের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনে যে অনিয়ম হয়েছে বলে বিরোধীরা দাবি করছেন, তার নেপথ্যে জ্ঞানেশ কুমারই মূল ব্যক্তি নন। সেই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, 'পদত্যাগ করুন, রাজসাক্ষী হন। আপনি ভুল করেছেন, কিন্তু এই ভুলের নেপথ্যে মূল মস্তিষ্ক আপনি নন।'
বিরোধীদের আন্দোলন প্রয়োজন হলে দীর্ঘদিন চলবে বলেও জানান রাহুল। তাঁর আরও দাবি, প্রায় ২০০ জন সরকারি আধিকারিক বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং তাঁদের তথ্য দিচ্ছেন। তবে এই দাবির পক্ষে বিস্তারিত তথ্য তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেননি।