
নেপালে হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা এখনও বেড়েই চলেছে। আর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে এই ধরনের দুর্যোগ আগামিদিনে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। আর এমন সতর্কতার মধ্যেই চিন্তা বাড়ছে সিকিমকে নিয়ে। কারণ, এই রাজ্যে এমন ৪০টি হিমবাহ হ্রদ বা গ্লেসিয়াল লেক চিহ্নিত করা গিয়েছে, যেগুলির জন্য ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। এর মধ্যে ১৬টি লেককে সর্বোচ্চ ঝুঁকির শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এগুলিতে সম্ভাব্য গ্লেসিয়াল লেক আউটব্রাস্ট ফ্লাড (জিওএলএফ) বা হিমবাহ হ্রদ ফেটে হঠাৎ করে বন্যা আসতে পারে। আর সেই দুর্যোগ প্রতিরোধে জোরদার পদক্ষেপ নিচ্ছে হিমালয়ের এই রাজ্য।
প্রসঙ্গত, ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। যার ফলে নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান আঘাত হানে। তারপরই সিকিম নিয়ে ভয় বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমবাহ গলতে থাকলে নতুন হ্রদ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে উপস্থিত লেকগুলিও আয়তনে বড় হতে পারে। ফলে একটু এদিক-ওদিক হলেই আচমকা বিপুল পরিমাণ জল নেমে আসতে পারে।
আসলে হিমবাহের আশপাশের নিচু জায়গায় বরফ গলতে থাকে। সেখানে জল জমে তৈরি হয় এই ধরনের হিমবাহ হ্রদ। আর সেটাই অনেক ক্ষেত্রে বিপদ ডেকে আনে।
লেকে জল বাড়লে, ভূমিকম্প হলে অথবা অন্য কোনও কারণে লেকের জল আটকে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। তখন আচমকাই প্রচুর পরিমাণ জল নীচে নেমে আসতে পারে। যার জন্য হতে পারে বিপদ। মানুষের প্রাণ যেতে পারে। ধ্বংস হতে পারে বাড়িঘর।
সিকিমে কতগুলি হ্রদের হাল খারাপ?
এমন পরিস্থিতিতে সিকিমে চিহ্নিত ৪০টি উচ্চঝুঁকির হ্রদ খুঁজে পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে ১৬টি রয়েছে ক্যাটাগোচি এ-তে রয়েছে। এগুলি সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
এছাড়া ২টি ক্যাটাগোরি বি, ৯টি ক্যাটাগোরি সি-তে রয়েছে। তবে বাকি ১৩টি হ্রদকে এখনও শ্রেণিতে রাখা হয়নি।
সিকিম ইতিমধ্যেই এই ধরনের বন্যার ভয়াবহতা দেখেছে
মাথায় রাখতে হবে, সিকিমে এই সব লেকের জলে বিপর্যয়ের ঘটনা নতুন কিছু নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে একটি জিওএলএফ-এর ঘটনায় অন্তত ৬০ জনের মৃত্যু হয়। এই সময় মাঙ্গান, গ্যাংটক, পাকিয়ং এবং নামচি জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ চুংথাং বাঁধও ধ্বংস হয়ে যায়।
বৃহস্পতিবার জিওএলএফ-এর ঝুঁকি কমানো নিয়ে একটি মিডিয়া কর্মশালায় সিকিমের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি সন্দীপ তাম্বে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, হিমবাহ হ্রদগুলির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে স্যাটেলাইট ছবি ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলের জন্য একটি বিশেষ জিওএলএফ রিস্ক মিটিগেশন প্রোটোকল তৈরির কাজ এখনও চলছে। এটি তৈরি হলে দেশের অন্যান্য হিমালয় অঞ্চলেও একই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা সম্ভব হতে পারে।
সব লেকের জন্য একই সমাধান নয়
প্রশাসনের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, প্রতিটি হিমবাহ হ্রদ একে অপরের থেকে আলাদা। তাদের পরিস্থিতি আলাদা। তাই সব জায়গায় একই ধরনের সমাধান প্রয়োগ করা সম্ভব নয়।
এই কারণে লোনাক কমপ্লেক্স, শাকো ছো হ্রদ এবং গুরুদাংমার কমপ্লেক্সের জন্য আলাদা প্ল্যান করা হয়েছে। সিকিমের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে শাকো ছো। লোনাক কমপ্লেক্সের ক্ষেত্রে মুগুথাংয়ের কাছে ডোলমা সাম্পায় বন্যার জল ধরে রাখার জন্য একটি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিকে গুরুদাংমার লেকের জল বেরনোর মুখে একটি দেওয়াল তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা হ্রদের জলের স্তর, জলপ্রবাহ, গভীরতা, সম্ভাব্য বন্যার গতিপথ এবং আশপাশের ভূপ্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করছেন।