
পুনের ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়াল হত্যা মামলার তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। প্রথমে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও, তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে। পুলিশের দাবি, কেতনের বাগদত্তা সিয়া গোয়েল বিয়েতে আগ্রহী ছিলেন না। পরিবারের চাপে তিনি সম্পর্কটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, আর সেই অনিচ্ছাই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়ায়।
চলতি বছরের নভেম্বরে কেতন ও সিয়ার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। দুই পরিবার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছিল। রাজস্থানে বিলাসবহুল প্রাসাদ বুক করা হয়েছিল, অতিথিদের যাতায়াতের জন্য রাখা হয়েছিল ব্যক্তিগত বিমানের ব্যবস্থাও। কিন্তু সেই সমস্ত পরিকল্পনা মুহূর্তে ভেস্তে যায় ১৮ জুনের ঘটনায়।
সেদিন সিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে দু’জনে পুনের কাছে ঐতিহাসিক লোহাগড় দুর্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন। পরে দুর্গ সংলগ্ন একটি গভীর খাদে পড়ে মৃত্যু হয় কেতনের। প্রথমে সিয়া দাবি করেছিলেন, ছবি তুলতে গিয়ে প্রবল হাওয়ার কারণে ভারসাম্য হারিয়ে খাদে পড়ে যান কেতন। সেই বয়ানের ভিত্তিতেই প্রথমে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
তবে তদন্তে একের পর এক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পুলিশ জানতে পারে, সিয়ার সঙ্গে পুনের বাসিন্দা চেতন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গত বছরের দীপাবলির সময় এক অনুষ্ঠানে তাঁদের পরিচয় হয় এবং এরপর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ চলতে থাকে। তদন্তকারীদের ধারণা, কেতনকে বিয়ে করতে না চাওয়া এবং চেতনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ইচ্ছা থেকেই কেতনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
পুলিশের দাবি, ১৮ জুনের ঘটনার আগেও কেতনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৪ জুন একই দুর্গে বেড়াতে গিয়ে একটি বিপজ্জনক জায়গার কাছে তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। তবে সেবার ঝোপ আঁকড়ে ধরে প্রাণে বেঁচে যান কেতন। পরে সিয়া ঘটনাটিকে ‘সাপ দেখে ভয় পেয়ে ধাক্কা দেওয়া’ বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন কেতন ও সিয়ার আগেই লোহাগড় দুর্গে পৌঁছে গিয়েছিলেন চেতন চৌধুরী। পরে নির্জন একটি স্থানে গিয়ে সিয়া ও চেতন মিলে কেতনকে প্রায় ৪০০ ফুট গভীর খাদে ঠেলে ফেলে দেন বলে অভিযোগ। এরপর পুরো ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার আগে একটি ক্যাফেতে বসে সিয়া ও চেতন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিলেন। মোবাইল ফোনের তথ্য, ডিজিটাল রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা এই অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছেন।
এদিকে কেতনের বাবা বিশাল আগরওয়ালও একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, বালিতে প্রাক্-বিবাহ ভ্রমণের পরিকল্পনাও ইচ্ছাকৃতভাবে বানচাল করেছিলেন সিয়া। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, কেতনের পাসপোর্ট রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ। তাঁর অভিযোগ, এটিও বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।
ছেলের মৃত্যুর পর সিয়ার আচরণও তাঁর কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। বিশালের দাবি, কেতনের মরদেহ বাড়িতে আনার পরও সিয়ার মধ্যে কোনও শোক বা মানসিক ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা যায়নি।
বর্তমানে সিয়া গোয়েল এবং চেতন চৌধুরী দু’জনেই গ্রেফতার। আদালত তাঁদের ২৯ জুন পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই ষড়যন্ত্রে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না। ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে চলেছে।
যে সম্পর্ক কয়েক মাস পর বিয়ের মণ্ডপে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেই সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে এক শিহরণ জাগানো খুনের মামলায়। এখন সকলের নজর পুলিশের তদন্ত এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।