
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে শনিবার সকালে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ হঠাৎ করেই ৫৯ বছর বয়সী পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে সাদা চাদর দিয়ে আড়াল করে দেয়। উপস্থিত জনতার নজর থেকে তাঁকে লুকিয়ে পুলিশ মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ওয়াংচুককে তাঁর বিছানা থেকে তুলে নিয়ে যায়।
দিল্লির তীব্র গরমে টানা ২১ দিন ধরে আমরণ অনশনে বসে রয়েছেন সোনম ওয়াংচুক। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হওয়ায় পুলিশ তাঁকে দ্রুত একটি অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে সফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে। পুলিশের দাবি, দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনের আয়োজকদের অভিযোগ, সোনম ওয়াংচুককে জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যন্তর মন্তরের এই দৃশ্য লাদাখের ইতিহাসকে যেন নতুন করে উস্কে দিল।
আজ থেকে চার দশকেরও বেশি সময় আগে সোনম ওয়াংচুকের বাবা সোনম ওয়াংইয়ালও ঠিক একইভাবে লাদাখের অধিকারের দাবিতে অনশনে বসেছিলেন।
লাদাখের জন্য অনশনকারী সেই মানুষটি কে?
সোনম ওয়াংইয়াল লাদাখের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার আগেই এভারেস্ট জয় করে ইতিহাস গড়েছিলেন। ১৯৬৫ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন। ১৯২৩ সালে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া ওয়াংইয়াল পরবর্তীকালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিধান পরিষদের সদস্য এবং পরে বিধায়ক ও মন্ত্রী হন।
'লাদাখ স্টাডিজ' জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ৮-এর দশকে লাদাখকে 'তফসিলি উপজাতি' (ST) মর্যাদা দেওয়ার আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই দাবি কেবল একটি সরকারি তকমার জন্য ছিল না, বরং বহিরাগত প্রভাব, নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং রাস্তাঘাট তৈরির ফলে লাদাখের আদিম সংস্কৃতি, ভাষা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব যেভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ছিল, তা থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
এই দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই ১৯৮৪ সালে আমরণ অনশনে বসেন ওয়াংইয়াল। তাঁর সেই আন্দোলন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তিনি লেহ পৌঁছে যান। যদিও সেই সময়ে আশ্বাসের পর অনশন ভাঙা হয়েছিল, কিন্তু লাদাখবাসীর আইনি স্বীকৃতি পেতে আরও পাঁচ বছর সময় লেগেছিল। ১৯৮৯ সালে সংবিধানের ৩৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে জম্মু ও কাশ্মীরের ৮টি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে (বালতি, বেডা, বোট, ব্রোকপা, চ্যাংপা, গারা, মোন ও পুরিগপা) তফসিলি উপজাতির মর্যাদা দেওয়া হয়।
চার দশক পর: চেনা ছবি, ভিন্ন লড়াই
চল্লিশ বছর পর আজ বাবা সোনম ওয়াংইয়ালের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছেলে সোনম ওয়াংচুক। গত বছরও লাদাখের পূর্ণ রাজ্যত্ব এবং সংবিধানের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের আওতাভুক্ত সুরক্ষার দাবিতে ৩৫ দিনের অনশন করেছিলেন ওয়াংচুক। কিন্তু এবার যন্তর মন্তরে তাঁর ১৯ দিনের অনশন লাদাখের জন্য ছিল না।
এবারের লড়াই ভারতের সাধারণ শিক্ষার্থী ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্য। সর্বভারতীয় 'নিট' (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP)-র ছাত্র আন্দোলনের পাশে সংহতি জানিয়ে অনশনে বসেছিলেন ওয়াংচুক। আন্দোলনকারীদের দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে এবং দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনতে হবে। এই পরীক্ষা দুর্নীতির মানসিক চাপে দেশজুড়ে ১৭ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাকে সামনে এনে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা করেন।
৮-এর দশকে বাবা অনশন করেছিলেন লাদাখের নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। আর আজ ছেলে অনশনে বসেছেন দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর অধিকার ও প্রশ্ন ফাঁসের কালিমামুক্ত এক শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে। ইতিহাসের চাকা ঘুরে গেলেও, রাষ্ট্রকে নিজেদের দাবি শুনতে বাধ্য করার হাতিয়ারটি কিন্তু একই রয়ে গিয়েছে, আর তা হল প্রাণ বাজি রেখে আমরণ অনশন।