
স্বামী রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন, তা একেবারেই চাননি সোনিয়া গান্ধী। এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন কংগ্রেস নেত্রী। তাঁর কথায়, রাজীব গান্ধীকে যখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি এই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। নিজের আসন্ন স্মৃতিকথা 'Belonging: A Journey of Love'-এ জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন সোনিয়া। তাঁর দাবি, বইটি প্রকাশ্যে এলে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। শুরু হতে পারে ‘তমাশা’ও।
মঙ্গলবার সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় সোনিয়া গান্ধী বলেন, 'আমার স্বামীকে যখন প্রধানমন্ত্রী হতে বলা হয়েছিল, তখন আমি এর সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলাম।' কেন স্মৃতিকথা লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি জানান, জীবনের ঘটনাগুলি তিনি যেভাবে দেখেছেন ও অনুভব করেছেন, সেই অভিজ্ঞতা নিজের মতো করে তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে এই বই।
সোনিয়ার কথায়, 'কিছু মানুষ হয়তো আমার সম্পর্কে তাঁদের ধারণা বদলাবেন। কারও কারও ধারণা আরও খারাপ হতে পারে। কিন্তু সেটাই স্বাভাবিক। আপনি যখন বই লেখেন বা জনজীবনে থাকেন, তখন এমন প্রতিক্রিয়া আসবেই। এখানে যেমন বলা হয়, একটা তমাশা তো হবেই।'
১০ নভেম্বর প্রকাশিত হবে স্মৃতিকথা
আগামী ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হওয়ার কথা সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা 'Belonging: A Journey of Love'। ইতালির শৈশব থেকে শুরু করে ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রে তাঁর দীর্ঘ যাত্রা, গান্ধী পরিবারের নানা ব্যক্তিগত মুহূর্ত এবং কংগ্রেসের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে বইটিতে।
সোনিয়ার এই মন্তব্য থেকেই ইঙ্গিত মিলছে, স্মৃতিকথায় এমন কিছু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ থাকতে পারে, যা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। বিশেষ করে রাজীব গান্ধীর রাজনীতিতে প্রবেশ, গান্ধী পরিবারের একের পর এক শোকাবহ ঘটনা এবং ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর নিজের বক্তব্য ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে সোনিয়ার আপত্তির প্রসঙ্গ অবশ্য এর আগেও আলোচনায় এসেছে। জাভিয়ের মোরোর নাটকীয় জীবনীভিত্তিক উপন্যাস 'Red Sari'-তে রাজীবের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সিদ্ধান্তকে সোনিয়ার কাছে মৃত্যুদণ্ডের মতো বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। বইটিতে দাবি করা হয়, রাজীবকে শপথ না নেওয়ার জন্য বোঝাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন সোনিয়া। তবে এবার নিজের স্মৃতিকথায় এই প্রসঙ্গে তিনি কী লিখেছেন, তা জানতে বই প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে।
ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে সোনিয়ার আত্মপ্রকাশ
গত ২২ অক্টোবর ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে প্রথমবারের মতো নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিয়ো প্রকাশ করেন সোনিয়া গান্ধী। দীর্ঘদিন ধরে নিজের বক্তব্য, চিঠি ও বার্তা প্রকাশের জন্য মূলত কংগ্রেসের সরকারি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতেন তিনি। সেই অভ্যাস থেকে সরে এসে নিজের অ্যাকাউন্টে স্মৃতিকথার পরিচিতি তুলে ধরেন কংগ্রেস নেত্রী।
ভিডিয়োয় দেখা যায়, স্মৃতিকথার কপি হাতে নিচ্ছেন সোনিয়া। পাশাপাশি মেয়ে তথা কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরার সঙ্গে মিষ্টি ভাগ করে নিতেও দেখা যায় তাঁকে। নিজের সন্তান রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পাশাপাশি কংগ্রেসের অ্যাকাউন্টও অনুসরণ করেছেন তিনি। দলের একাধিক প্রবীণ নেতাও তাঁর অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করেছেন। স্মৃতিকথাটিকে সোনিয়া বর্ণনা করেছেন ‘ভালবাসা, কর্তব্য, হারানো এবং নিজের জায়গা খুঁজে পাওয়ার’ কাহিনি হিসেবে।
ইতালি থেকে রাজীবের সঙ্গে পরিচয়, উঠে আসবে পারিবারিক শোক
সোনিয়ার স্মৃতিকথা শুরু হয়েছে যুদ্ধ-পরবর্তী ইতালির ভেনেতো অঞ্চলে তাঁর শৈশবের দিনগুলি দিয়ে। এরপর কেমব্রিজে পড়তে যাওয়ার সময় ১৯৬৫ সালে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের কথা উঠে এসেছে। রাজীবের সঙ্গে বিয়ে, শাশুড়ি তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে পরিচয় এবং ভারতীয় জীবনে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে বইয়ে।
গান্ধী পরিবারের একাধিক মর্মান্তিক ঘটনাও স্মৃতিকথার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যু, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলি কীভাবে পরিবারকে প্রভাবিত করেছিল, তার বিবরণও থাকবে বলে জানা গিয়েছে।
ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি রাজনীতিতে সোনিয়া গান্ধীর উত্থান, কংগ্রেসকে ফের শক্তিশালী করার চেষ্টা এবং ২০০৪ সালের নির্বাচনে জয়ের পর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সময় তাঁর ভূমিকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
২০০৪ সালে কেন প্রধানমন্ত্রী হননি সোনিয়া?
২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে হারিয়ে ক্ষমতায় ফেরে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ। কংগ্রেসকে জয়ে নেতৃত্ব দিলেও প্রধানমন্ত্রী হননি সোনিয়া গান্ধী। তাঁর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। সোনিয়ার এই সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
এবার রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে নিজের আপত্তির কথা প্রকাশ্যে এনে সোনিয়া যেন গান্ধী পরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্কের আরও একটি ব্যক্তিগত দিক সামনে আনলেন। তাঁর স্মৃতিকথায় এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে আরও কী অভিজ্ঞতা ও ভাবনা উঠে আসে, তা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত।