
বর্ষা এখন অতীত। শীতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। যদিও এরই মধ্যে নতুন করে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এল নিনো। যার ফলে দেশে জলের চরম সঙ্কট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার এই পরিস্থিতি ঠিক কীভাবে সামাল দেয় ভারত। আসলে ২০২৬ সালে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে দেশের একাধিক জায়গায় জলাধারগুলিতে জলের পরিমাণ কমে গিয়েছে। ভূগর্ভস্থ জলের উপর চাপ বাড়ছে। যার ফলে পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
আর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো এরই মধ্যে শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো। ফলে আগামী কয়েক মাসে ভারতের জল নিয়ে বিপদ বাড়ছে।
সমস্যাটা শুধু এটা নয় যে, চলতি বছর বৃষ্টি কম হয়েছে। আসল উদ্বেগ হল, তাপমাত্রা যদি বাড়ে, তাহলে কৃষিকাজে এবং শহরগুলিতে জলের চাহিদা বাড়বে। যার ফলে জল সঙ্কটের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
কম বৃষ্টিতে জল সঙ্কটের আশঙ্কা বৃদ্ধি
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষার মরসুমে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ১২.৫৬ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জলাধারগুলিতে। সেখানে জল সঞ্চয় কমেছে।
কেন্দ্রীয় জল কমিশন (CWC) বর্ষার শেষে জানিয়েছে, এই সময় তাদের পর্যবেক্ষণে থাকা ১৭৮টি জলাধারে মোট ১৩২.৭৩৪ বিলিয়ন ঘনমিটার জল মজুত ছিল। অথচ গত ১০ বছরের গড় মজুতের পরিমাণ ১৫১.১১৮ বিলিয়ন ঘনমিটার। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায়ও জলাধারগুলিতে জলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, দেশের সর্বত্রই জল শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে জলাধারের পরিস্থিতি আলাদা। তবে জাতীয় স্তরে জল মজুতের পরিমাণ কমে গেলে বিপদ। বিশেষত, দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ইতিমধ্যেই মহারাষ্ট্রের কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিড জেলায় স্থানীয় জলাধারগুলিতে জলের পরিমাণ কমে গিয়েছে। ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে গিয়েছে। এমনকী পানীয় জলের জন্য ট্যাঙ্কারের উপর নির্ভরতা বাড়ার খবর সামনে এসেছে। মোটের উপর খড়া পরিস্থিতি।
তেলঙ্গানার হায়দরাবাদে জল সরবরাহকারী জলাধারগুলিতে জলের পরিমাণ কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প জল সরবরাহের ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
এল নিনো পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে?
ওদিকে আবার বিশ্ব জলবায়ু পরিস্থিতি ভারতের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অক্টোবর মাসে আমেরিকার ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) জানিয়েছে, এল নিনো শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২৭ সালের গোড়া পর্যন্ত শক্তিশালী থেকে অতি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। আপ তাতেই বিপদ।
আসলে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্ব অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ুর উপর প্রভাব পড়ে।
ভারতের ক্ষেত্রে এল নিনোর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর দুর্বল হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৬ সালের বর্ষায় ইতিমধ্যেই স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এখানে সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত জলাধারগুলিতে নতুন করে জল ভরে কম। অন্যদিকে জলের চাহিদা বজায় থাকে। শীতকালীন ফসলের জন্য কৃষকদের সেচের প্রয়োজন হয়। বৃষ্টিপাত পর্যাপ্ত না হলে খাল ও অন্যান্য জলাধার থেকে জলের ঘাটতি মিটবে না। তখন ভূগর্ভস্থ জল তোলার পরিমাণ বাড়তে পারে।
তবে শীতেও তেমন একটা সমস্যা নেই। বরং বড় চ্যালেঞ্জ আসতে পারে ২০২৭ সালের গরমকালে। তাপমাত্রা বাড়লে জলের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। এমন পরিস্থিতিতে চাপে থাকা জলাধার এবং ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার আরও দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে শুধু এল নিনোর উপর নির্ভর করে ভারতের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। দেশজুড়ে ভয়াবহ খরা অবশ্যম্ভাবী, এমনটা বলা যায় না। তবে জলসঙ্কটের ঝুঁকির দিকে নজর রাখা জরুরি।
আসল সংকট লুকিয়ে ভূগর্ভস্থ জলে
কেন্দ্রীয় ভূগর্ভস্থ জল বোর্ডের (CGWB) ২০২৫ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারতে বছরে প্রায় ২৪৭.২২ বিলিয়ন ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ জল তোলা হয়। দেশের বার্ষিক উত্তোলনযোগ্য ভূগর্ভস্থ জলসম্পদের ৬০.৬৩ শতাংশ এই পরিমাণের সমান।
তবে জাতীয় স্তরের এই পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে একাধিক অঞ্চলের গুরুতর সমস্যা। মূল্যায়নে ৭৩০টি ভূগর্ভস্থ জল মূল্যায়ন ইউনিটকে 'অতিরিক্ত উত্তোলিত' বা ওভার-এক্সপ্লয়টেড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ওই অঞ্চলগুলিতে ভূগর্ভস্থ জল তোলার পরিমাণ বার্ষিক জল ভরে ওঠার আনুমানিক পরিমাণকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
বর্ষায় বৃষ্টি কম হলে ভারতের বহু অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলই জরুরি পরিস্থিতিতে ভরসা জোগায়। কিন্তু যে এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার আগে থেকেই কমে গিয়েছে, সেখানে এই বিকল্প ব্যবস্থাও সবসময় কার্যকর হয় না।
জলস্তর নেমে গেলে কুয়ো থেকে জল তোলার পরিমাণ কমতে পারে। এমনকী জল তোলার খরচও বেড়ে যায়। গভীর নলকূপ চালু থাকলেও আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবার এবং ছোট কৃষকদের পক্ষে পর্যাপ্ত জল পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আবার দুর্বল বর্ষার কারণে জলের চাহিদা বাড়লে সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। ফলে পরবর্তী বর্ষা আসার আগেই কিছু এলাকার মানুষ তীব্র জল সঙ্কটে পড়তে পারেন।
এছাড়া শক্তিশালী এল নিনো এই চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তবে বিপদ এই নয় যে, ভারতের প্রতিটি অঞ্চল জলশূন্য হয়ে পড়বে। বরং যেসব অঞ্চলে জলের মজুত ইতিমধ্যেই কম, সেখানে জলের চাহিদা বাড়ার সময় আরও তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।