
ই২০ পেট্রোলের দিকে এগিয়ে গিয়েছে ভারত। আর তার প্রভাব ইতিমধ্যেই চিনির দামের উপর পড়তে শুরু করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের বাজারে চিনির সঙ্কট ধরা পড়েছে। যার জেরে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ সুরক্ষিত রাখতে সরকার চিনির রফতানিতেও বিধিনিষেধ জারি করেছে। তা সত্ত্বেও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে চিনির দাম। পরিস্থিতি এমন জায়গায় রয়েছে যে, চিনি আমদানির কথাও ভাবতে হচ্ছে কেন্দ্রকে।
বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের মতে, এই সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ হল ইথানল উৎপাদনের জন্য আখের একটি বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া। যার ফলে দাম বাড়ছে চিনির।
এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার রয়টার্সের একটি রিপোর্ট জানিয়েছে, পণ্যের উপর থাকা ১০০ শতাংশ আমদানি শুল্ক তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে ভারত। আর এটা চিনি আমদানির প্রস্তুতি হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
আর দেশে এমন সময় চিনির দাম বেড়েছে, যখন সামনেই রয়েছে উৎসবের মরসুম। এই সময়ে মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। অন্যদিকে, ই২০ লক্ষ্যে পৌঁছতে ভারত ইথানল উৎপাদনের জন্য ক্রমশ বেশি পরিমাণে আখ ব্যবহার করছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা বনাম চিনির দাম- এই দুইয়ের মধ্যে বড় টানাপোড়েন শুরু হয়ে গিয়েছে।
মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে, যা ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিনি বাণিজ্যকেন্দ্র, আগস্টের শুরু থেকে পাইকারি চিনির দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এখানে প্রতি ১০০ কেজিতে দাম হয়েছে ৫,৩৫০ টাকা। তথ্য বলছে, মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গোটা দেশে চিনির গড় খুচরো দাম ছিল প্রতি কেজি ৫২.৩ টাকা। আর এটাই চিন্তায় রাখছে কেন্দ্রকে।
যদিও দেশের বিভিন্ন অংশে চিত্রটা আরও ভয়ঙ্কর। কিছু বাজারে দাম আরও দ্রুত বেড়েছে। পঞ্জাবে খুচরো চিনির দাম প্রায় ৬৫ টাকা প্রতি কেজি ছুঁয়েছে। মুম্বই, ভোপাল-সহ কয়েকটি জায়গায় দাম পৌঁছে গিয়েছে ৫৮ থেকে ৬৩ টাকা প্রতি কেজিতে। যার ফলে বিপদে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
তাই উৎসবের মরসুমে চিনির ঘাটতি যাতে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ করতে চাইছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, পেট্রোলে ইথানল মেশানোর কর্মসূচি যেন খাদ্যপণ্যের দামকে প্রভাবিত না করে, সেই দিকটা নিশ্চিত করতে চাইছে সরকার।
ইথানলের দৌড়েই কি চিনির দাম বাড়ছে?
এখন দেশে মিলছে ইথানল ব্লেন্ডেড পেট্রোল। অপরোশিত তেলের আমদানি কমাতে ভারত ক্রমশ বেশি পরিমাণে আখ থেকে ইথানল উৎপাদন করছে। সেটা মেশানো হচ্ছে পেট্রোলে।
এই উদ্দেশ্যে গত কয়েক বছরে সরকার বহু ডিস্টিলারি তৈরিতে জোর দিয়েছে। অল ইন্ডিয়া ডিস্টিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (AIDA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের ৪৯৯টি কেন্দ্রে বছরে প্রায় ১,৮২২ কোটি লিটার ইথানল উৎপাদনের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
AIDA-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইথানল উৎপাদনের কাঁচামালের প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশ আসে আখ থেকে। বাকি অংশ আসে ভুট্টা ও চাল থেকে।
আর আখের এই ব্যবহার সরাসরি চিনির বাজারে প্রভাব ফেলছে। কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুধীর পানওয়ার ইন্ডিয়া টুডে ডিজিটাল-কে বলেন, 'ইথানল উৎপাদনের জন্য আখ সরিয়ে নেওয়ার ফলে ভারতে চিনির দাম বেড়েছে।'
তবে তিনি মনে করেন, চিনির বাজারে এতটা চাপ পড়ার কথাই নয়। তাঁর সন্দেহ, অন্য কিছু কারণেও দাম বেড়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, 'চিনির বাজারের অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না। এটাও ইঙ্গিত করে যে চিনি মজুতকারী ও খুচরো বিক্রেতার বাজারে কারসাজি থাকতে পারে।'
তাঁর মূল উদ্বেগ হল, জ্বালানি নীতির কারণে যেন খাদ্যপণ্যের দাম না বাড়ে। যদিও আখ চাষের জমির পরিমাণ বেড়েছে বলেই জানিয়েছেন তিনি।
জমি বাড়ার পরও চিনির ঘাটতি কেন?
পানওয়ার বলেন, 'সরকার যখন আখ ও চিনি উৎপাদনের হিসেব দিয়েছিল, তখন পরিস্থিতি এতটা গুরুতর ছিল না। এর অর্থ দাঁড়ায়, সেই সময় হয় পরিসংখ্যান সঠিক ছিল না, নয়তো বাজারে কারসাজি হয়েছে। কিংবা ইথানলের জন্য আখ আলাদা করার বিষয়টি ভারসাম্যপূর্ণ ছিল না।'
কেন চিনির আমদানি শুল্ক কমাতে চাইছে সরকার?
ভারত সরকারের নীতিগত অবস্থান থেকেই বোঝা যাচ্ছে পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। ব্রাজিলের পর ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি রফতানিকারক দেশ। ১৯৬০ সাল থেকে ভারত চিনি রফতানি করে আসছে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে গত কয়েক বছরে রফতানি নীতি ধীরে ধীরে কঠোর করেছে কেন্দ্র।
এখন রিপোর্ট অনুযায়ী, সরকার চিনির উপর আমদানি শুল্ক কমানোর কথা বিবেচনা করছে। এর ফলে প্রায় এক দশক পর ফের বিদেশ থেকে চিনি আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বম্বে সুগার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অশোক জৈন রয়টার্সকে বলেন, 'দেশের বাজারে চিনির সরবরাহ বেশ কম। উৎসবের মরসুমে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানোর জন্য একমাত্র আমদানিই সাহায্য করতে পারে।'
কেন হঠাৎ এতটা উদ্বিগ্ন সরকার?
চিনির দাম হঠাৎ একদিনে বাড়েনি। ২০২৩ সালের শুরুতে ভারতে খুচরো চিনির দাম মোটামুটি ৪০–৪৫ টাকা প্রতি কেজি ছিল। তবে ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে ৫০ টাকারও বেশি হয়েছে। তাতেই চিন্তিত সরকার। এমন পরিস্থিতিতে একাধিক অ্যাকশনের কথা ভাবছে তারা।