
ঘণ্টায় ১৭৫ কিলোমিটারেরও বেশি গতি সঞ্চয় করে জাপানের ডাইতো এবং রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জের দিকে ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন ডলফিন। এই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব শুধু পূর্ব এশিয়াতেই পড়বে এমনটা নয়। ভারতের উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও নজর রয়েছে আবহাওয়াবিদদের।
যদিও এই সুপার টাইফুনের সরাসরি কোনও প্রভাব ভারতের উপর পড়ার আশঙ্কা নেই, তবে পশ্চিম উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী টাইফুন তৈরি হলে তা সাময়িকভাবে বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে মৌসুমী বায়ুর আর্দ্রতার জোগান এবং বিভিন্ন আবহাওয়া ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে ভারতের কিছু অংশে বৃষ্টিপাত সাময়িকভাবে থমকে যেতে পারে।
সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, টাইফুন ডলফিন বর্তমানে মিনামিডাইতো দ্বীপের প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থান করছে এবং ঘণ্টায় প্রায় ১৭ কিলোমিটার বেগে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বর্তমানে এই ঝড়ের জেরে ঘণ্টায় ১৭৫ কিলোমিটার বেগে হাওয়া বইছে এবং দমকা হাওয়ার গতি ঘণ্টায় ২১০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে। গত এক সপ্তাহে একাধিকবার শক্তি বৃদ্ধি করে এটি সুপার টাইফুনে পরিণত হয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ডাইতো দ্বীপপুঞ্জের কাছে পৌঁছবে ডলফিন। এরপর গতি কমিয়ে ওই দিনই ওকিনাওয়ার দিকে এগোবে।
এই ঝড়ের প্রভাবে রিউকিউ এবং আমামি দ্বীপপুঞ্জে ঘণ্টায় বিধ্বংসী গতির ঝোড়ো হাওয়া, ১০০ থেকে ২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত প্রবল বৃষ্টিপাত হবে। কোনও কোনও অংশে ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রে ১০ থেকে ১১ মিটার উচ্চতার ঢেউ উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস।
তবে জাপানের বাইরেও এই টাইফুন বৃহত্তর এশীয় মৌসুমী বায়ুতে কীভাবে পারস্পরিক প্রভাব ফেলতে পারে, সে দিকে বিশেষ নজর রয়েছে আবহাওয়াবিজ্ঞানীদের।
আবহাওয়াবিদদের মতে, টাইফুন এবং ভারতের মৌসুমী বায়ুর মধ্যে তাপ, আর্দ্রতা এবং বায়ুমণ্ডলীয় শক্তিকে কেন্দ্র করে এক ধরনের 'প্রতিযোগিতা' চলে। পশ্চিম উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে ওই অঞ্চলে বজ্রগর্ভ মেঘের বিচরণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের উপর বজ্রঝড় তৈরির প্রবণতা কমে যায়।
বঙ্গোপসাগরই হল মৌসুমী বায়ুর নিম্নচাপ ও গভীর নিম্নচাপ তৈরির প্রধান ক্ষেত্র, যা মধ্য, পূর্ব এবং উত্তর ভারতে বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টি নিয়ে আসে। এই ধরনের নিম্নচাপ তৈরি না হলে বৃষ্টিপাত সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
শক্তিশালী টাইফুন মৌসুমী অক্ষরেখার অবস্থানেও পরিবর্তন আনতে পারে এবং বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরের বায়ুপ্রবাহের ধরণ বদলে দিতে পারে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে নতুন করে বৃষ্টিবাহী আবহাওয়া ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, শুধু টাইফুন ডলফিনের কারণে ভারতে দীর্ঘস্থায়ী 'মনসুন ব্রেক' পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ডলফিনের প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে এটি কত দিন শক্তিশালী অবস্থায় থাকে এবং পশ্চিম দিকে এগিয়ে দক্ষিণ চিন সাগরে প্রবেশ করে কি না, অথবা পূর্ব চিনের দিকে বাঁক নেয় কি না, তার উপর।
বর্তমান পূর্বাভাসের বিভিন্ন মডেলে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু মডেলে ঝড়টির চিনের পূর্ব উপকূলের ওয়েনঝৌয়ের কাছে স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। আবার কিছু মডেলে তাইঝৌয়ের কাছাকাছি স্থলভাগে আছড়ে পড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বর্তমানে ভারতের মৌসুমী বায়ু একাধিক বৃহৎ জলবায়ুগত উপাদানের প্রভাবে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এল নিনো, ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (Indian Ocean Dipole বা IOD) এবং বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরির হার।
এই পরিস্থিতিতে টাইফুন ডলফিন সাময়িকভাবে বঙ্গোপসাগরে নতুন আবহাওয়া ব্যবস্থা গঠনের প্রক্রিয়া দমন করতে পারে। এর ফলে ভারতের কয়েকটি অংশে অস্থায়ীভাবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে আবহাওয়াবিদদের মতে, টাইফুনটি দুর্বল হয়ে গেলে বা ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে সরে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এরপর বঙ্গোপসাগর আবার নিম্নচাপ তৈরির অনুকূল হয়ে উঠবে এবং সেই নিম্নচাপগুলিই সারা দেশে মৌসুমী বৃষ্টিপাত বজায় রাখতে সাহায্য করবে।