
দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন এক ছাত্র। অভিযোগ, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ছাত্রছাত্রীদেরও সেই আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে ৫ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড দেওয়ার নোটিস দিয়েছিল গ্রেটার নয়ডার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত। পরে অবশ্য সেই নোটিশ প্রত্যাহার করে নেয় পুলিশ। কিন্তু বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি।
বুধবার এই ঘটনা নিয়ে গ্রেটার নয়ডা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। কারণ, ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনও রকম জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে আগেই স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। সেই নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন ছাত্রকে এমন নোটিশ দেওয়া হল, সেটিই জানতে চাইল প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, আদালত যখন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কোনও ছাত্রের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, তখন কোনও ম্যাজিস্ট্রেট সেই নির্দেশ অমান্য করতে পারেন না। লাইভ ল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন, 'ম্যাজিস্ট্রেট এমন নোটিশ দেওয়ার সাহস পেলেন কীভাবে?'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম, কোনও ছাত্রের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। কোনও ম্যাজিস্ট্রেট আমাদের সেই নির্দেশ লঙ্ঘন করতে পারেন না।'
কী হয়েছিল অক্ষত ত্রিপাঠীর সঙ্গে?
এই ঘটনা গৌতম বুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র অক্ষত ত্রিপাঠীকে ঘিরে। বুধবার মৌখিকভাবে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনেন প্রবীণ আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য।
তাঁর বক্তব্য, গ্রেটার নয়ডার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট অক্ষতকে একটি নোটিশ দিয়েছিলেন। সেখানে তাঁকে কারণ দর্শাতে বলা হয়- কেন শান্তি বজায় রাখার জন্য তাঁকে ৫ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড দিতে বলা হবে না। পুলিশের একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ওই নোটিস জারি করা হয়েছিল। পরে অবশ্য পুলিশ নোটিশটি প্রত্যাহার করে নেয়।
পুলিশের অভিযোগ ছিল, অক্ষত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়াচ্ছেন এবং তাঁদের ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে হওয়া প্রতিবাদে যোগ দিতে উৎসাহিত করছেন।
পুলিশের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, অক্ষতের এই ধরনের কার্যকলাপের ফলে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে মারামারি বা ঝগড়া হতে পারে। এর ফলে শান্তি এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৫ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড, সঙ্গে দু’টি জামিনদার
লাইভ ল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর গ্রেটার নয়ডার তৃতীয় এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত থেকে অক্ষত ত্রিপাঠীকে ওই নোটিস দেওয়া হয়েছিল। নোটিশে বলা হয়েছিল, পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অক্ষতের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁকে কারণ দর্শাতে বলা হয়, কেন তাঁকে ৫ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে বাধ্য করা হবে না।
শুধু ব্যক্তিগত বন্ডই নয়, নোটিশ অনুযায়ী তাঁকে ৫ লক্ষ টাকা করে দু’টি জামিনদার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। অর্থাৎ, অক্ষতকে ৫ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত বন্ডের পাশাপাশি ৫ লক্ষ টাকা করে দু’টি জামিনদার দেওয়ার সম্ভাবনার মুখে পড়তে হয়েছিল।
অক্ষত অবশ্য পুলিশের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণভাবেই অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসেও যাচ্ছিলেন না বলে জানিয়েছেন।
‘ছাত্রদের মধ্যে ভয় তৈরি করা যাবে না’
সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টি তোলার সময় আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, নয়ডা এবং উত্তরপ্রদেশের কর্তৃপক্ষ এভাবে দেশের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভয় তৈরি করতে পারে না। তিনি এই ঘটনাকে ভারতের ছাত্রদের নিয়ে একটি ‘পরীক্ষা’ বলেও উল্লেখ করেন।
আইনজীবীর অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে ছাত্রদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পরে নোটিস প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও আদালতের নির্দেশ অমান্য করার ঘটনা মুছে যায় না।
তাঁর বক্তব্য ছিল, 'আদালত অবমাননা একবার হয়ে গেলে শুধু নোটিস প্রত্যাহার করে নিলেই সেই অবমাননা মুছে যায় না।'
আদালত অবমাননার অভিযোগ
আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য এই ঘটনাকে আদালত অবমাননা হিসেবেও দেখার দাবি করেন।
তাঁর বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্ট যখন স্পষ্টভাবে ছাত্রদের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, তখন সেই নির্দেশের পরও একজন ছাত্রের বিরুদ্ধে এমন নোটিস জারি করা আদালতের নির্দেশকে অমান্য করার শামিল।
তবে শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, নোটিস যেহেতু ইতিমধ্যেই প্রত্যাহার করা হয়েছে, তাহলে এই ঘটনায় আর কোনও আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি অবশিষ্ট রয়েছে কি না।
আইনজীবী অবশ্য নিজের বক্তব্যে অনড় থাকেন। তাঁর দাবি, নোটিস প্রত্যাহার করলেও আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘনের ঘটনা থেকে যায়। তাই আদালত অবমাননার বিষয়টিও শেষ হয়ে যায় না।
'আমরা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি'
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনাও। ঘটনাটি শুনে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বিস্ময় প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেন, 'আমাদের তরুণদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। আমরা এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি।'
অর্থাৎ, ছাত্রদের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে আদালতের অবস্থান যে পরিষ্কার, তা ফের জানিয়ে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। বেঞ্চ আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যকে পুরো ঘটনা এবং অক্ষত ত্রিপাঠীকে দেওয়া নোটিস আদালতের রেকর্ডে জমা দিতে বলেছে। এরপর গ্রেটার নয়ডা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে আদালত।