
রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারতকে বারবার চাপ দিচ্ছে আমেরিকা। এমনকী রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বসানোর ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার একটি বিলও আমেরিকার হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে পাস হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, আমেরিকা যখন নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী রাশিয়ার কাছ থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনছে, ইউরোপের বহু দেশ এখনও রাশিয়ার গ্যাস আমদানি করছে, তখন ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে এত আপত্তি কেন?
রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকারও ব্যবসা চলছে
আমেরিকার বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে মোট ৫.৯ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকার রাশিয়ায় রফতানি এবং রাশিয়া থেকে আমদানি- দুই রয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই বাণিজ্য প্রায় ১৪.৪ শতাংশ বেশি।
শুধু রাশিয়া থেকে আমদানির হিসাব দেখলেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে আমেরিকা রাশিয়া থেকে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই আমদানি প্রায় ২৫.৬ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ, রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু রুশ পণ্য এখনও আমেরিকার বাজারে ঢুকছে। এর মধ্যে রয়েছে সার, ইউরেনিয়াম, বিভিন্ন শিল্পসামগ্রী, রাসায়নিক এবং অন্যান্য কৌশলগত পণ্য।
ইউরোপও পুরোপুরি রাশিয়া থেকে বেরোয়নি
রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুধু আমেরিকা নয়, ইউরোপের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলি রাশিয়া থেকে প্রায় ৩৬-৩৮ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করেছে বলে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যাচ্ছে। EU-এর মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ১২-১৩ শতাংশ এখনও রাশিয়া থেকে এসেছে।
রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি দেশ এখনও রাশিয়ার LNG বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কিনছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন এবং নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলির নাম এই তালিকায় রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম দিকেও রাশিয়া থেকে ইউরোপের LNG আমদানিতে বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার মতো দেশ এখনও পাইপলাইনের মাধ্যমে রুশ গ্যাসের উপর নির্ভর করে। পুরনো চুক্তির কারণেও ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের কিছু অংশ এখনও চলছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৭ সালের মধ্যে রাশিয়ার গ্যাসের উপর নির্ভরতা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে।
তাহলে ভারতের রাশিয়ার তেলে আপত্তি কেন?
ভারত ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনেছে। মূল কারণ, রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপের বাজারের একটা বড় অংশ হারানোর পর ভারত ও চিনের মতো এশীয় বাজারে তুলনামূলক কম দামে তেল বিক্রি করতে শুরু করে। আর ভারত সেই সুযোগ নেয়। ভারতের যুক্তি, রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কেনা দেশের সাধারণ মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পেট্রল, ডিজেল, পরিবহণ খরচ এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপর।
আমেরিকার অভিযোগ অবশ্য অন্য জায়গায়। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, রাশিয়ার তেল কেনার মাধ্যমে রাশিয়ার রাজস্ব বাড়ছে এবং সেই অর্থ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভারত তেল না কিনলে কী হত?
ভারতের মতো বড় দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে তেল না কিনলে বিশ্ব বাজারে কী প্রভাব পড়ত, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলি রুশ তেলের উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে রাশিয়ার তেলের একটা বড় অংশ ইউরোপের বাজার থেকে এশিয়ার দিকে চলে যায়।
ভারত এবং চিন সেই তেলের বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে।
ভারতের মতো বড় অর্থনীতি রাশিয়ার তেল না কিনলে রাশিয়াকে অন্য বাজার খুঁজতে হত। পরিস্থিতি খারাপ হলে রাশিয়ার তেল উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারত। তাতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। সরবরাহ কমলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে পারত। এর প্রভাব পড়ত বিশ্বের প্রায় সব দেশের অর্থনীতিতে।
ভারতীয় রিফাইনারিগুলিও রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ডিজেলসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য তৈরি করে। এই পণ্যগুলির একটা অংশ আবার আন্তর্জাতিক বাজারেও যায়। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ভারত-রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ এবং জ্বালানির দামও জড়িত।
আমেরিকাই কি ভারতকে ছাড় দিয়েছিল?
রুশ তেল নিয়ে আমেরিকার নীতিতেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে আমেরিকা ভারতকে সাময়িকভাবে ৩০ দিনের একটি ওয়েভার দিয়েছিল। সেই সময় ভারতকে রাশিয়ার কাছ থেকে ছাড়ের দামে তেল কেনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এর পিছনে আন্তর্জাতিক তেল বাজারের পরিস্থিতি বড় কারণ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ফলে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার তেলও যদি বাজার থেকে আরও বড় পরিমাণে সরে যেত, তাহলে সরবরাহের উপর আরও চাপ তৈরি হতে পারত। তাই আমেরিকার পক্ষ থেকেও সাময়িকভাবে কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছিল বলে ওই তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এখান থেকেই প্রশ্ন রুশ তেল নিয়ে আমেরিকার নীতি কি সবসময় একই? রাশিয়া নিয়ে নতুন বিল কী বলছে?
এবার আমেরিকার হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে পাস হওয়া নতুন বিল নিয়ে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই বিল আইনে পরিণত হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার উপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবেন। একইসঙ্গে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বসানোর ক্ষমতাও দেওয়া হতে পারে।
এই বিলের প্রভাব ভারত ও চিনের উপর পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কারণ দুই দেশই রাশিয়ার বড় তেল ক্রেতা। CREA-র দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রফতানিতে চিনের অংশ ছিল প্রায় অর্ধেক। এরপর ভারতের অংশ ছিল প্রায় ৩৭ শতাংশ। তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
ভারতের সামনে চাপ কোথায়?
ভারতের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাশিয়ার তেল কেনা শুধু বিদেশনীতি নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। একদিকে ভারতকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য ট্যারিফের বিষয়টি দেখতে হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের জন্য সস্তায় তেল আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের বিষয়টিও রয়েছে।
ভারত-আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে মার্কিন চাপের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই বিল ভারতকে বাণিজ্য আলোচনায় আরও চাপের মধ্যে ফেলতে পারে। আবার অন্য পক্ষের বক্তব্য, ভারতের মতো দেশের নিজের জ্বালানি প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
ভারতের অবস্থান কী?
ভারত এখনও পর্যন্ত বলে এসেছে, দেশের জ্বালানি প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে মাথায় রেখেই তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভারত শুধু একটি দেশ থেকে তেল কেনে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। ফলে রাশিয়া তার অন্যতম উৎস হলেও একমাত্র উৎস নয়। এখন প্রশ্ন হল, একই নিয়ম কি সব দেশের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
আমেরিকা রাশিয়া থেকে প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য আমদানি করছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশও এখনও রুশ গ্যাস ও LNG-এর উপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে ভারত ও চিনের রুশ তেল কেনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের চাপ বাড়ছে।
এই দ্বৈততার অভিযোগই এখন ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের একটি বড় বিতর্কের জায়গা। তবে শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে একাধিক বিষয়ের উপর- দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক তেলের দাম, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক এবং আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক।