
ভারতীয় রেলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। দেশের প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন এখন রেলপথে নামার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রুটে চলবে এই অত্যাধুনিক ট্রেন। প্রায় ৯০ কিলোমিটারের পথ অতিক্রম করতে সময় লাগবে প্রায় দু'ঘণ্টা। ১০টি বগি নিয়ে তৈরি এই ট্রেনটি পথে ১১টি স্টেশনে থামবে।
১৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই ট্রেনের উদ্বোধন করবেন। ডিজেল বা প্রচলিত বিদ্যুতের বদলে হাইড্রোজেন জ্বালানি ব্যবহার করায় এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। চলার সময় ট্রেনটি থেকে নির্গত হবে শুধু জলীয় বাষ্প, ফলে বায়ুদূষণ হবে না বললেই চলে।
কী কী রয়েছে এই ট্রেনে?
১০ বগির এই ট্রেনে রয়েছে আটটি যাত্রীবাহী কোচ এবং দুটি পাওয়ার কার বা ইঞ্জিন কোচ। ট্রেনটির মোট শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২,৪০০ কিলোওয়াট এবং একসঙ্গে প্রায় ২,৬০০ জন যাত্রী বহন করতে পারবে। স্বাভাবিক অবস্থায় ঘণ্টায় প্রায় ৭৫ কিলোমিটার গতিতে চলবে এটি।
রেল মন্ত্রকের দাবি, এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী হাইড্রোজেন ট্রেন। ট্রেনটি তৈরি হয়েছে চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি (ICF)-তে। আর এর অত্যাধুনিক ফুয়েল সেল সিস্টেম নির্মাণ করেছে টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস।
কীভাবে কাজ করে হাইড্রোজেন ট্রেন?
ডিজেল বা বৈদ্যুতিক ট্রেনের তুলনায় হাইড্রোজেন ট্রেনের প্রযুক্তি সম্পূর্ণ আলাদা। ট্রেনের বিশেষ উচ্চচাপযুক্ত ট্যাঙ্কে হাইড্রোজেন গ্যাস সংরক্ষণ করা হয়। হরিয়ানার জিন্দে তৈরি হয়েছে একটি বিশেষ প্ল্যান্ট, যেখানে জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ (Electrolysis) করে হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হয়।
এরপর ট্রেনের ফুয়েল সেলের ভিতরে হাইড্রোজেনের সঙ্গে বাতাসের অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। সেই বিদ্যুৎ মোটরে শক্তি জোগায় এবং ট্রেনটি চলতে শুরু করে।
কেন এই প্রযুক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ?
হাইড্রোজেন ট্রেনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এর চলাচলের সময় কোনো ধোঁয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ক্ষতিকর দূষক নির্গত হয় না। এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার একমাত্র উপজাত হল জলীয় বাষ্প এবং কিছু তাপ।
ফলে ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় এর কার্বন নিঃসরণ কার্যত শূন্য। পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি বিশ্ব উষ্ণায়নের মোকাবিলাতেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত এখন জার্মানি, চীন ও ফ্রান্সের মতো হাইড্রোজেন ট্রেন পরিচালনাকারী দেশগুলির তালিকায় যোগ দিল।
আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও কড়া নিরাপত্তা
যাত্রীদের জন্য ট্রেনে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় দরজা, ডিসি এয়ার কন্ডিশনিং, আরামদায়ক আসন-সহ একাধিক আধুনিক সুবিধা।
হাইড্রোজেন অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গ্যাসটি বিশেষ উচ্চচাপযুক্ত ট্যাঙ্কে সংরক্ষণ করা হবে এবং ট্রেনের জন্য আলাদা রিফুয়েলিং স্টেশনও তৈরি করা হয়েছে।
সফল হয়েছে উচ্চগতির পরীক্ষাও
চূড়ান্ত পরিষেবা শুরুর আগে গবেষণা নকশা ও মান সংস্থা (RDSO) ট্রেনটির গতি, ব্রেকিং ব্যবস্থা, কম্পনসহ বিভিন্ন দিক খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে এই হাইড্রোজেন ট্রেনের সফল উচ্চগতির পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে।