
স্ট্রেট অফ হরমুজ বা হরমুজ প্রণালী কবে এবং কীভাবে ভারতের জন্য খুলবে? এই প্রশ্নের জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নীতির ভিত্তিতেই এই জলপথ খোলার ব্যবস্থা করা হবে। তবে তার জন্য আমেরিকাকে নাকাবন্দি বন্ধ করতে হবে বলে দাবি করেছেন তিনি।
ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের ফরেন অ্যাফেয়ার্স এডিটর গীতা মোহনের সঙ্গে এক্সক্লুসিভ কথোপকথনে পেজেশকিয়ান জানান, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি বিশেষ সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আরব দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীরাও ওমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। সেই আলোচনার মাধ্যমে কোনও সমঝোতায় পৌঁছনো সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন বা IMO পরিস্থিতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করবে বলে জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
ভারতের জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কী বললেন?
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ভারতের অন্যতম বড় উদ্বেগ হল এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী ভারতীয় জাহাজ এবং নাবিকদের নিরাপত্তা। কারণ এই জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এই প্রসঙ্গেই পেজেশকিয়ানকে প্রশ্ন করা হয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কি তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী ভারতীয় নাবিক এবং জাহাজ নিরাপদ থাকবে?
জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট জানান, হরমুজ প্রণালী খোলার বিষয়টি একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধানের দিকে এগোতে পারে। ওমানের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। আরব দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীরাও আলোচনায় যুক্ত হতে পারেন। সমঝোতা হলে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির ঘোষণা করা হবে বলে তাঁর বক্তব্য।
আমেরিকাকে কী শর্ত দিচ্ছে ইরান?
তবে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও স্পষ্ট করেছেন পেজেশকিয়ান। তাঁর দাবি, এই জলপথ স্বাভাবিক করতে হলে আমেরিকাকে নাকাবন্দি এবং শত্রুতামূলক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু আঞ্চলিক স্তরে আলোচনা করলেই পরিস্থিতির সমাধান হবে না বলে মনে করছে তেহরান। মার্কিন পদক্ষেপের সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতিকে সরাসরি যুক্ত করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকা যদি নাকাবন্দি এবং নিষেধাজ্ঞা বন্ধ করে, তাহলে পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
'প্রথমে কে হামলা করেছে, সেটা দেখতে হবে'
হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পেজেশকিয়ানকে ইরান ছাড়াও হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুথিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়।
এর জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, এই পরিস্থিতির সূচনা ইরান বা হিজবুল্লাহ করেনি। তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলি নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য পদক্ষেপ করছে। তাই প্রথমে কে হামলা করেছে, সেটিই আগে দেখা প্রয়োজন।
পেজেশকিয়ানের অভিযোগ, শত্রুপক্ষ হামলা চালাচ্ছে, অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করছে এবং যোগাযোগের পথ বন্ধ করছে। এরপর ইরান কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাবে না—এমনটা আশা করা যায় না বলেই তাঁর দাবি।
'আমরা বেঁচে আছি, তাই জবাব দেব'
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, যতক্ষণ তাঁরা জীবিত, ততক্ষণ হামলার জবাব দেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, কোনও দেশের উপর হামলা হলে সেই দেশ আত্মরক্ষার জন্য প্রতিক্রিয়া জানাবে। তিনি বলেন, জীবিত থাকলে জবাব দিতে হবে, কারণ মারা গেলে আর জবাব দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন, সামরিক চাপের মুখে তেহরান নিজের অবস্থান থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কথা এখনই ভাবছে না।
নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আমেরিকাকে আক্রমণ
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। তাঁর দাবি, নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সাধারণ মানুষের উপর পড়ে। এর ফলে মানুষ কাজ হারায়, দারিদ্র্য বাড়ে এবং সমাজে অসন্তোষ তৈরি হয়।
তাঁর বক্তব্য, যদি আমেরিকা যুদ্ধ করতে চায়, তাহলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করা উচিত। সাধারণ মানুষকে নিশানা করা উচিত নয়।
পেজেশকিয়ানের দাবি, সামরিক উপায়ে নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করতে না পেরে আমেরিকা এখন অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করছে। তবে সেই চেষ্টাতেও আমেরিকা সফল হবে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
হরমুজের সমাধানে কি BRICS গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
পেজেশকিয়ানের মতে, BRICS এমন একটি মঞ্চ, যা বর্তমান ‘বন্ধ পথ’ খুলতে সাহায্য করতে পারে। বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দেশগুলির মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে BRICS গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে তাঁর বক্তব্য।
অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালী নিয়ে শুধু সামরিক বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেও বিষয়টিকে দেখতে চাইছে ইরান।
কীভাবে খুলতে পারে হরমুজ প্রণালী?
পেজেশকিয়ানের বক্তব্য থেকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের অবস্থান মোটামুটি স্পষ্ট। তাঁর কথায়, প্রথমে ওমানের সঙ্গে বিশেষ সামুদ্রিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। এরপর আরব দেশগুলিও আলোচনায় যুক্ত হতে পারে। সমঝোতায় পৌঁছনো গেলে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে।
তবে এর পাশাপাশি আমেরিকার নাকাবন্দি এবং শত্রুতামূলক কার্যকলাপ বন্ধ করার দাবিও রেখেছেন তিনি।
ফলে ভারতের জন্য হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি এখন কেবল ইরান-আমেরিকা সম্পর্কের উপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে ওমান, আরব দেশগুলি এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।