
হরিয়ানার পানিপথে মানি এক্সচেঞ্জ অফিসে গুলি, দিল্লিতে পাঞ্জাবি গায়ক গুরু রনধাওয়ার জিমের বাইরে হামলা, আর এবার মুম্বইয়ে বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি। গত সাত মাসে দেশের একাধিক জায়গায় এমন কয়েকটি হামলার ঘটনায় উঠে এসেছে অনিল পণ্ডিতের নাম। তদন্তকারীদের দাবি, বিদেশে বসে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হয়ে কাজ করে অনিল। যদিও গ্যাংয়ে তার সঠিক অবস্থান এবং সাম্প্রতিক হামলাগুলিতে তার ভূমিকা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
রবিবার, ১৮ অক্টোবর মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে অনিল পণ্ডিতের নাম। হামলায় অভিনেতার গুলির আঘাত লাগেনি। তবে তাঁর গাড়ির চালক আহত হন। ঘটনার পর একটি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে হামলার দায় স্বীকার করা হয় বলে খবর। ‘অনিল পণ্ডিত অনমোল বিষ্ণোই’ নামে ওই অ্যাকাউন্টের পোস্টে হামলার দায় নেওয়া হয়। পরে অ্যাকাউন্টটি মুছে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সামনে আসে একটি অডিয়ো ক্লিপ, যেখানে সলমন খানের সঙ্গে কাজ করা নিয়ে বলিউডের তারকাদের হুঁশিয়ারি দিতে শোনা যায় এক ব্যক্তিকে। ওই ব্যক্তি নিজেকে অনিল পণ্ডিত বলে দাবি করে।
অডিয়ো ক্লিপে তাকে বলতে শোনা যায়, 'সবকা নম্বর আয়েগা’, অর্থাৎ সবার পালা আসবে। তবে ওই অডিয়ো ক্লিপের সত্যতা এবং হামলার সঙ্গে এর যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ। মুম্বই পুলিশ গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
কে এই অনিল পণ্ডিত?
অনিল পণ্ডিতকে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিদেশে থাকা এক অভিযুক্ত সহযোগী বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। সে আমেরিকায় রয়েছেন বলে অনুমান। রণদীপ মালিক, হ্যারি বক্সার এবং হরমন সান্ধুর মতো বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযুক্ত কয়েকজনের নামের সঙ্গেও বিভিন্ন হামলার দায় স্বীকার এবং পুলিশি তদন্তে অনিলের নাম উঠে এসেছে।
তবে গ্যাংয়ের মধ্যে তার সঠিক ভূমিকা কী, বর্তমানে তিনি কোথায় রয়েছেন এবং টাইগার শ্রফের উপর হামলার ঘটনায় তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা কতটা, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
১৪ মার্চ পানিপথে গুলি, নিশানায় মানি এক্সচেঞ্জ অফিস
চলতি বছরের ১৪ মার্চ হরিয়ানার পানিপথের আসন্ধ রোডে হ্যাস্ট ফরেক্স নামে একটি মানি এক্সচেঞ্জ অফিসে গুলি চালায় মোটরবাইকে আসা তিন দুষ্কৃতী। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনায় সাত রাউন্ড গুলি চলে। হামলার সময় অফিসের ভিতরে এক মহিলা-সহ তিনজন ছিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় রণদীপ মালিক ও অনিল পণ্ডিতের নামে একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে হামলার দায় স্বীকার করা হয় বলে দাবি। ওই পোস্টে মানি এক্সচেঞ্জ সংস্থাটির বিরুদ্ধে বেআইনি হাওয়ালা লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। একই সঙ্গে গায়ক বাদশাকেও হুমকি দেওয়া হয়। তাঁর বিরুদ্ধে হরিয়ানার সংস্কৃতির ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়েছিল ওই পোস্টে।
তবে হামলার লক্ষ্য ছিলেন বাদশা, এমন নয়। গুলি চালানো হয়েছিল মানি এক্সচেঞ্জ অফিসে। তদন্তে এই ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২১ মার্চ সন্দীপ, কৃষ্ণ ওরফে কাকু এবং কুণাল নামে তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ২৯ মার্চ সোনিপতের রথধনা গ্রামের বাসিন্দা প্রাঞ্জলকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, হামলাকারীদের সঙ্গে বিদেশে থাকা নির্দেশদাতাদের যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পানিপথ পুলিশের সিআইএ-১ ইউনিটের তৎকালীন ইনচার্জ ইন্সপেক্টর ফুল কুমার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, অভিযুক্তদের এক জনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৬৫ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বিদেশে থাকা নির্দেশদাতারা হামলার জন্য টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ।
১১ জুন গুরু রনধাওয়ার জিমের বাইরে গুলি
পানিপথের ঘটনার প্রায় তিন মাস পর, ১১ জুন দিল্লির পশ্চিম বিহারে পাঞ্জাবি গায়ক গুরু রনধাওয়ার সঙ্গে যুক্ত ২৪ এইচএস ফিটনেস জিমের বাইরে গুলি চলে। মোটরবাইকে আসা মুখঢাকা দুই ব্যক্তি সাত রাউন্ড গুলি চালায়। গুলিতে জিমের কাচ ভেঙে গেলেও কেউ আহত হননি।
এর পর একটি ফেসবুক পোস্টে অনিল পণ্ডিতের নাম করে হামলার দায় স্বীকার করা হয় বলে দাবি। পোস্টে অভিযোগ করা হয়েছিল, সলমন খানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে সতর্ক করা হলেও গুরু রনধাওয়া সেই হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেছেন। ওই হামলার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে দিল্লি পুলিশ আরমান, তুষার, সাগর ও হকিকত নামে চারজনকে গ্রেফতার করে। সাগর ও হকিকতকে ২৫ জুন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে খবর।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, অনিল পণ্ডিত ও হ্যারি বক্সারের নির্দেশে কাজ করেছিল ধৃতেরা। এক অভিযুক্তের কাছ থেকে পাকিস্তানে তৈরি বলে সন্দেহ করা একটি টিটি-৩০ ধরনের পিস্তলও উদ্ধার করা হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার আগের দিন অভিযুক্তেরা বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করেছিল।
এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে হরিয়ানার হাঁসিতে জিম প্রশিক্ষক কপিল রেধুর হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, বিদেশে থাকা নির্দেশদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সিগন্যাল ও জানগির মতো এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করত অভিযুক্তেরা।
ব্যবসায়ীকে তোলাবাজির হুমকি, অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ
অনিল পণ্ডিতের নাম শুধু তারকাদের হুমকি বা গুলিচালনার ঘটনায় নয়, তোলাবাজি এবং বেআইনি অস্ত্র সরবরাহের তদন্তেও উঠে এসেছে। ১২ জুলাই দিল্লি পুলিশ বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা একটি মডিউলের তিন সদস্যকে গ্রেফতারের কথা জানায়। অভিযোগ, দিল্লি-এনসিআর এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের খুনের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
এর আগে ৮ মার্চ রোহিণীর এক ব্যবসায়ী বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে এক কোটি টাকা চাওয়ার অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তদন্তে শিব গোবিন্দ, অভিনব ওরফে আকাশ সিং এবং বিবেক নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে তিনটি পিস্তল ও ২৬টি কার্তুজ উদ্ধার হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়।
দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শশাঙ্ক জয়সওয়ালের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তকারীরা কয়েকটি বাড়ি ও গয়নার দোকানের ছবি এবং নজরদারি সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছিলেন। ওই জায়গাগুলিকে সম্ভাব্য নিশানা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহের পিছনে অনিল পণ্ডিতের ভূমিকা রয়েছে বলে সন্দেহ পুলিশের।
১৭ সেপ্টেম্বর গায়ক দিলের খারকিয়ার গাড়িতে গুলি
১৭ সেপ্টেম্বর হরিয়ানার ভিওয়ানি জেলার খরক গ্রামের কাছে নিজের ফার্মহাউসের বাইরে গুলিচালনার শিকার হয় হরিয়ানভি গায়ক দিলের খারকিয়ার একটি রেঞ্জ রোভার গাড়ি। ঘটনার সময় গায়ক সেখানে ছিলেন না। এই হামলার তদন্তেও অনিল পণ্ডিতের নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা। পরে তার নাম থাকা একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে হামলার দায় স্বীকার করা হয় বলে খবর।
৩ অক্টোবর সোনিপতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর রোহিত ওরফে বুঢ়া নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিলের খারকিয়ার গাড়িতে গুলিচালনা-সহ একাধিক মামলায় তাকে খুঁজছিল পুলিশ।
বিদেশে বসে নির্দেশ, দেশজুড়ে হামলার অভিযোগ
পানিপথ থেকে দিল্লি, হরিয়ানা হয়ে এবার মুম্বই—গত সাত মাসে একাধিক গুলিচালনা ও হুমকির ঘটনায় অনিল পণ্ডিতের নাম সামনে এসেছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, বিদেশে থাকা নির্দেশদাতারা স্থানীয় শ্যুটারদের মাধ্যমে হামলা চালানোর জন্য অস্ত্র ও টাকা সরবরাহের ব্যবস্থা করতেন। তবে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র এবং অনিল পণ্ডিতের নির্দিষ্ট ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে তদন্ত এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলিচালনার ঘটনা ফের প্রশ্ন তুলেছে, বিদেশে থাকা অভিযুক্ত গ্যাং সদস্যদের নির্দেশে কীভাবে দেশের ভিতরে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।