
তৃণমূল জমানায় তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়নি ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার তাঁকে সাড়ম্বরে স্বাগত জানাল। BJP সরকারের পশ্চিমবঙ্গে এসে নিজের ধর্মীয় কথা শোনালেন বাগেশ্বর বাবা ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। কিন্তু তার মাঝেই বাঙালিদের দুর্গাপুজোয় আমিষ খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়ে চরম বিতর্কের সৃষ্টিও করলেন। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা দুর্গাপুজোর সময়ে আমিষ খান, তাঁরা পাষণ্ড। ফলত ননভেজ পরিত্যাগের নিদান দিয়েছেন তিনি। চর্চা যখন তুঙ্গে তখন জেনে নেওয়া যাক, এই ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী আসলে কে? কীভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন এই বাগেশ্বর বাবা?
অলৌকিক ক্ষমতার স্বঘোষিত ধর্মগুরু এই বাগেশ্বর বাবা। তাঁর আসল নাম ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ গর্গ। মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলার গড়া গ্রামে তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা কেটেছে চরম আর্থিক দুর্দশায়। তাঁর ঠাকুরদা ছিলেন পুরোহিত। নির্মোহী আখড়ায় হনুমান মন্দিরের কাছে ভক্তদের নিয়ে সভা বসাতেন। সেখান থেকেই রামচরিতমানস পাঠে হাতেখড়ি। এরপর একটু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কথাবাচক হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু হয়। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ ওই নির্মোহী আখড়ার কাছেই নিজের ‘দৈব দরবার’ শুরু করেন
হঠাৎই সাধারণ ধীরেন্দ্রর ভোল পাল্টে যেতে শুরু করে। হয়ে ওঠেন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বাগেশ্বর বাবা। নিজেকে বাগেশ্বর ধাম সরকারের অধিপতি মনে করেন তিনি। তাঁর হাতে সর্বদাই থাকে একটি গদা। মাথায় থাকে পাগড়ি। মধ্যপ্রদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন এই ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী দেশ-বিদেশে জনপ্রিয়। ভক্তের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ভক্তদের মনের কথা নাকি সহজেই পড়ে ফেলতে পারেন তিনি।
ভক্তরা কিছু বলার আগেই তিনি কাগজের একটি চিরকুটে লিখে দেন তাঁদের সমস্যা কিংবা মনস্কামনা। ভক্তেরা মনে করেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। কারও সম্পর্কে না জেনেই নাকি তিনি কাগজে গড়গড় করে তাঁদের সম্পর্কে লিখে ফেলেন। শরীর থেকে 'ভূত' ছাড়াতেও নাকি তাঁর জুড়ি মেলা ভার। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানা যায়, বাগেশ্বর বাবা প্রতিটি ধর্মীয় কথা অনুষ্ঠানের জন্য আড়াই থেকে সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা নেন। তাঁর মোট সম্পত্তি ৩০ কোটির কাছাকাছি।
এত বছর মূলত হনুমানজি এবং ধর্মীয় নানা প্রবচন বলতেন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান খুব স্পষ্ট হয়েছে। জেকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র যোদ্ধা’ হিসাবেও চিহ্নিত করেছেন বাগেশ্বর বাবা। ভারতকে হিন্দু জাতি হিসাবে ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাগেশ্বরধামে গিয়ে তাঁকে নিজের 'ছোট ভাই' হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
অতীতে একাধিকবার তাঁর মন্তব্যের জন্য বিতর্কে জড়িয়েছিলেন এই ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। NCERT-র তৃতীয় শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকের একটি অধ্যায়ে 'লভ জিহাদ' প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। একবার প্রকাশ্য মঞ্চে বলেছিলেন, সিঁদুর ও মঙ্গলসূত্র না পরা মহিলারা খালি প্লট। শিরডির সাঁইবাবাকে ভগবান মানতে রাজি হননি। ছত্রপতি শিবাজীকেও নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী।
জানা যায়, তাঁর ভাই শালগ্রাম গর্গ কখনও বিয়ের আসরে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে পারমিট করতে গিয়ে ধরা পড়েন, কখনও আবার পুলিশের খাতায় নাম লেখান বন্দুকবাজি করে।
ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁকে সরাসরি বিতর্কসভায় যোগ দেওয়ার জন্য চ্যালেঞ্জ করেন ভারতীয় যুক্তিবাদী শ্যাম মানব।
এবার তিনি বাংলায় এসে দুর্গাপুজো নিয়ে ননভেজ না খাওয়ার নিদান দিয়ে রাতারাতি শিরোনামে উঠে এসেছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আতিথেয়তায় আপ্লুত হয়েছেন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। বলেছেন, 'পশ্চিমবঙ্গ এখন সুরক্ষিত হাতে রয়েছে। এখানে এবার রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হবে।' নাম না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে কটাক্ষ করে বলেন, 'আমায় বলা হয়েছিল বাংলায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। কিন্তু এখন আমার দাদা সত্তায় এসেছেন। এখন ক্ষমতায় কোনও বাবরওয়ালি নেই, রঘুবীরওয়ালে আছেন।'