
কালো ফ্রেমের চশমা, মুখে মাস্ক আর গলায় স্কার্ফ। পোশাক ও চেহারার মিল দেখে দিল্লি পুলিশের ধারণা হয়েছিল, তারা অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-এর সভাপতি নেহা বোরাকে খুঁজে পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, যাঁকে পুলিশ ধরতে ছুটছে, তিনি আসলে নেহা বোরাই নন! হুবহু এক মুখের গড়ন, এক পোশাক হলেও অন্য এক মহিলাকে আটক করে ফেলেছে তারা। আর এই নিয়েই তৈরি হল বিভ্রান্তি। সেই সুযোগে দিল্লির কনট প্লেসে বিক্ষোভ চালিয়ে গেলেন আসল নেহা।
রবিবার SIR প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল কক্রোচ জনতা পার্টি (CJP)। সেই বিক্ষোভ ঘিরেই ঘটে এই নাটকীয় ঘটনা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় সোশ্যাল মিডিয়ার নেহার একটি রহস্যময় পোস্ট ঘিরে। AISA নেত্রী লেখেন, 'Do I have your attention? Watch closely. Stay ready. Time & Venue incoming.' অর্থাৎ, তিনি যে কোনও সময় আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন, সেই ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর একটি ভিডিও বার্তা আসার নেহার তরফে। তিনি জানান, দুপুর ২টো ৩০ মিনিটে আরকে আশ্রমে জমায়েত হবে। জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানোর দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সমর্থকদের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বার্তা ছিল, 'See you there, don't be late.'
কিন্তু আরকে আশ্রমে পৌঁছতেই তৈরি হয় বিভ্রান্তি। নেহার মতো দেখতে এক মহিলাকে দেখে পুলিশ তাঁকেই আন্দোলনের নেত্রী বলে মনে করে। এরপর তাঁকে আটক করা হয়। অন্যদিকে, আসল নেহা তখন কনট প্লেসে AISA-র অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে ব্যারিকেড পেরিয়ে পুলিশের নজর এড়িয়ে এগিয়ে যান তিনি।
পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেহা নিজেই জানান, তাঁরা ব্যারিকেড পেরিয়ে কনট প্লেসে পৌঁছে গিয়েছেন। X-এ তিনি লেখেন, 'We have crossed the barricades and reached CP.' এরপরই গোটা ঘটনা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। নিজের মতো দেখতে ওই মহিলার সঙ্গে একটি ছবিও পোস্ট করেন নেহা। ছবির সঙ্গে তিনি লেখেন, 'The tale of the two Nehas. Not strategy, just coincidence.' অর্থাৎ, দুই নেহার কাহিনি। কোনও পরিকল্পনা নয়, নিছকই কাকতালীয় ঘটনা।
তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাননি আসল নেহাও। বিজয় চকে তাঁকে আটক করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি নিয়েও কটাক্ষ শুরু করেন নেহার সমর্থকরা। এক নেটিজেন লেখেন, 'হাজার হাজার পুলিশ, শত শত নজরদারি ব্যবস্থা এবং বিপুল অর্থ খরচ করেও নেহা বোরার লুকালাইকের কারণে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল দিল্লি পুলিশ।' আর এক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী লেখেন, 'অন্য নেহার উপস্থিতিতে পুলিশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এরপর আসল নেহার আবির্ভাব ঘটে। গোটা বিষয়টি যথেষ্ট চাঞ্চল্যকর।'
২০০-র বেশি বিক্ষোভকারী আটক
রবিবারের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে দিতে যন্তর মন্তরের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। এই ঘটনায় ২০০-রও বেশি মানুষকে আটক করা হয়।
AISA, SFI, ক্রান্তিকারী যুব সংগঠন (KYS)-এর সদস্যদের পাশাপাশি CJP-র সমর্থকদেরও আটক করা হয়। কনট প্লেস ও আরকে আশ্রম মার্গ-সহ একাধিক জায়গায় চলে ধরপাকড়। সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটের পরেও আটক করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও আটক হন বলে নেটমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছে। তাঁদের কাছে প্রেস কার্ড থাকা সত্ত্বেও আটক করা হয়েছিল বলে দাবি। কনট প্লেসের ইনার সার্কেলের ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা মিছিল করে এগোচ্ছেন এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন। তাঁদের মুখে শোনা যায়, 'জ্ঞানেশ কুমার ইস্তিফা দো'। পুলিশকর্মীরা বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে এগিয়ে আসেন। অনেককে হাত ধরে টেনে পুলিশের বাসে তোলা হয়। কেউ কেউ রাস্তায় টানতে টানতেই স্লোগান দিতে থাকেন।
নিরাপত্তায় ৩০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসেনা
বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তরে পৌঁছনো আটকাতে দিল্লি জুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ৩০ হাজারেরও বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং ভোটার তালিকার SIR প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে CJP ও বিরোধী দলগুলি। CJP-র তরফে জানানো হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।