
হিন্দু ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল অক্ষয় তৃতীয়া। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে অক্ষয় তৃতীয়ার উৎসব পালিত হয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, যে কোনও কাজ সম্পন্ন করার জন্য এদিন অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। লক্ষ্মী- নারায়ণের আরাধনা এবং নতুন জিনিস কেনার জন্যও এই দিনটিকে সেরা মনে করা হয়। কথিত আছে, এই শুভ তিথিতে কেনা জিনিসের ফল চিরস্থায়ী হয়। বিশেষ করে এদিন সোনা কেনা খুবই শুভ।
সংস্কৃত অনুসারে 'অক্ষয়' শব্দের অর্থ হল 'যার কোনও ক্ষয়' নেই অর্থাৎ যা কখনও শেষ হয় না। তাই মনে করা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায় করা যে কোনও কাজ অক্ষয় থাকে। সেই সঙ্গে শাস্ত্র মতে, অক্ষয় তৃতীয়া সুখ প্রদানকারী এবং পাপ নাশকারী তিথি। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ব্যবসায়ী লক্ষ্মী- গণেশ পুজোর আয়োজন করেন। অনেকে দোকানে এদিন হালখাতাও হয়। শুধু দোকান নয়, অনেকে বাড়িতেও পুজো করেন। এছাড়া বিভিন্ন মন্দিরে ভক্তেরা ভিড় জমান। বিশ্বাস করা হয় যে, এদিন সোনা কিনলে পরিবারে সুখ-সমৃদ্ধি ঘটে।
অক্ষয় তৃতীয়া ২০২৬-র কবে পড়েছে?
এবছর অক্ষয় তৃতীয়া কোন দিন পড়েছে তা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। ১৯ এপ্রিল (বাংলায় ৫ বৈশাখ) ও ২০ এপ্রিল (বাংলায় ৬ বৈশাখ) অক্ষয় তৃতীয়ার শুভ তিথি পড়েছে।
তৃতীয়া তিথি কতক্ষণ থাকবে?
১৯ এপ্রিল বেলা ১/১৩/১৮ থেকে ২০ এপ্রিল সকাল ১০/৫১/৫৮ পর্যন্ত তৃতীয়া থাকবে। তাই এই দু'দিনের মধ্যে যে কোনও একদিন পুজো করা যেতে পারে।
সোনা- রুপো কেনার শুভ সময়
১৯ এপ্রিল অক্ষয় তৃতীয়ার দিন সোনা কেনার সবচেয়ে শুভ সময় হল সকাল ১০:৪৯ থেকে শুরু করে ২০ এপ্রিল ভোর ৫:৫১ পর্যন্ত।
কেনাকাটার শুভ লগ্ন
প্রাতঃকালীন মুহূর্ত (চর, লাভ, অমৃত) - সকাল ১০:৪৯ থেকে দুপুর ১২:২০ পর্যন্ত
অপরাহ্ণ মুহূর্ত (শুভ) - দুপুর ১:৫৮ থেকে বিকেল ৩:৩৫ পর্যন্ত
সায়ংকালীন মুহূর্ত (শুভ, অমৃত, চর) - সন্ধ্যা ৬:৪৯ থেকে রাত ১০:৫৭ পর্যন্ত
দৃক পঞ্চাঙ্গ অনুসারে, ২০ এপ্রিল সোনা কেনাকেও শুভ বলে মনে করা হয়। এই ক্ষেত্রে সোনা কেনার শুভ সময়টি হল ভোর ৫:৫১ থেকে সকাল ৭:২৭ পর্যন্ত।
কথিত আছে যে, অক্ষয় তৃতীয়ার দিন ভগবান বিষ্ণু এবং দেবী লক্ষ্মীর বিশেষ আশীর্বাদ লাভ করা যায়। তাই এই শুভ উপলক্ষে সোনা ও রুপো কেনাকে মানুষ অত্যন্ত মঙ্গলজনক বলে মনে করেন। তবে, বর্তমানে সোনার অত্যধিক দামের কারণে সকলের পক্ষে তা কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেক্ষেত্রে এমন কিছু সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যের সামগ্রী রয়েছে, যেগুলিকে সোনা ও রুপোর মতোই মূল্যবান ও শুভ বলে গণ্য করা হয়।
স্বল্পমূল্যের এই সামগ্রী কিনুন
যদি অক্ষয় তৃতীয়ায় আপনার পক্ষে সোনা বা রুপো কেনা সম্ভব না হয়, তাহলে এদিন ধনে বীজ, তামার বাসনপত্র, লাল রঙের বস্ত্র, চাল, ঘি, মাটির পাত্র, প্রদীপ, ফুলের টব এবং ছোট ছোট দেব-দেবীর মূর্তি কিনতে পারেন।
অক্ষয় তৃতীয়ার গুরুত্ব
এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকটি পুরাণের কথা। শোনা যায় মহাভারতে কৌরবদের কাছে পাশা খেলায় হেরে বারো বছরের জন্য বনবাস ও এক বছরের জন্য অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন পাণ্ডবরা। তাদের বনবাসে থাকার সময়ে ফের কৌরবদের চক্রান্তে মুনি দুর্বাসা তার শিষ্যদের নিয়ে এক রাতে পাণ্ডবদের আশ্রয় গ্রহণ করতে যান। কিন্তু সেই সময় তাদের ঘরে কোনও অন্ন ছিল না। ক্ষুধার্ত মুনি দুর্বাসা অভিশাপ দেবেন ভেবে ভয় পান পাণ্ডব ও দ্রৌপদী। ঠিক সেই সময়ে শ্রীকৃষ্ণ এসে হাঁড়ির তলায় লেগে থাকা একটিমাত্র চালের দানা খেয়ে নেন। আর অবাক করা বিষয়, তাতেই পেট ভরে যায় দুর্বাসা ও তাঁর শিষ্যদের। দুর্বাসার অভিশাপ থেকে এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই পাণ্ডবদের রক্ষা করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তাই এই দিনটিকে শুভ বলে মনে করা হয়।
আবার অন্য একটি চলতি পৌরাণিক কথা অনুসারে, বিষ্ণুর নবম অবতার কৃষ্ণ দ্বাপর যুগে জন্মগ্রহণ করেন মর্ত্যে। তার সুদামা নামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ বন্ধু ছিলেন। সুদামা একদিনব ভুলবশত কৃষ্ণের সব খাবার খেয়ে ফেলেছিলেন। এরপর তিনি শ্রীকৃষ্ণকে খাবার দিতে একমুঠো চাল নিয়ে তার ঘরে আসেন। তাকে খাওয়ানোর জন্য বন্ধু সুদামার এই আচরণ মুগ্ধ করেছিল শ্রীকৃষ্ণকে। এরপর শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদে সুদামার সমস্ত দারিদ্র্য ঘুচে যায়। মনে করা হয় যেদিন এই ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন ছিল বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি। তাই দিনটি বিশেষ শুভ।
এছাড়াও শোনা যায়,অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেই পরশুরাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেজন্যেও এই দিনটি শুভ।
অক্ষয় তৃতীয়ায় মাটির তৈরি সামগ্রী কেনা শুভ কেন?
জ্যোতিষীদের মতে, মাটির তৈরি বস্তু মঙ্গল গ্রহের সঙ্গে সম্পর্কিত। মঙ্গলকে শক্তি, ভূমি এবং সাহসের কারক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই, অক্ষয় তৃতীয়ায় মাটির তৈরি বস্তু কিনলে মঙ্গলের অবস্থান শক্তিশালী হয় এবং আর্থিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ঋণমুক্তি বা দেনামুক্তির সম্ভাবনাও তৈরি হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন একটি মাটির পাত্র কিনে তাতে বিশুদ্ধ জল অথবা গঙ্গা জল পূর্ণ করে গৃহে স্থাপন করলে সুখ ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায় এবং ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার ঘটে। এই কারণেই, এই বিশেষ দিনে কেবল গয়নার দোকানগুলোতেই নয়, মৃৎশিল্পীদের দোকানেও প্রচুর ভিড় দেখা যায়।