
হিন্দু ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ বাৎসরিক উৎসব অম্বুবাচী। বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অম্বুবাচী, অমাবতী বলেও পরিচিত। ভারতের একাধিক স্থানে অম্বুবাচী উৎসব, রজঃউৎসব নামেও পালিত হয়। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শাস্ত্রের নানা কাহিনি। লোকবিশ্বাস অনুসারে ,আষাঢ় মাসের ৭ তারিখে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে পৃথিবী বা ধরিত্রী মা রজঃস্বলা হন। এই সময়টিতে অম্বুবাচী পালন করা হয়।
বাংলা প্রবাদে রয়েছে, ‘কিসের বার কিসের তিথি, আষাঢ়ের সাত তারিখ অম্বুবাচী।’ এদিন থেকেই হয় অম্বুবাচী শুরু। জ্যোতিষ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, সূর্য যে বারের যে সময়ে মিথুন রাশিতে গমন করেন, তার পরবর্তী সেই বারের সেই কালে অম্বুবাচী হয়। অর্থাৎ, পৃথিবী এই সময়ে ঋতুমতী হন। হিন্দু শাস্ত্রে ও বেদে পৃথিবীকে মা বলা হয়ে থাকে। এমনকী পৌরাণিক যুগেও পৃথিবীকে ধরিত্রী মাতা বলে সম্বোধন করা হয়েছে। মনে করা হয়, আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের চতুর্থ পদে ঋতুমতী হন ধরিত্রী। পূর্ণ বয়স্কা ঋতুমতী নারীরাই কেবল সন্তান ধারণে সক্ষম হোন। তাই অম্বুবাচীর পর ধরিত্রীও শস্য শ্যামলা হয়ে ওঠেন।
অম্বুবাচী ২০২৬-র দিনক্ষণ
অম্বুবাচী শুরুর পর তিন দিন চলে এই উৎসব। চলতি বছরে অম্বুবাচী প্রবৃত্তিঃ অর্থাৎ শুরু হবে ২২ জুন (সোমবার) অর্থাৎ ৭ আষাঢ় রাত ৭.৩৮ মিনিটে এবং ২৬ জুন (শুক্রবার) অর্থাৎ ১১ আষাঢ় রাত ঘ ১০।৫৭ মিনিটে এর নিবৃত্তিঃ অর্থাৎ সমাপ্তি হবে।
কামাক্ষ্যা মন্দিরে অম্বুবাচী
সতীপিঠের অন্যতম অসমের কামাক্ষ্যা মন্দির। এই মন্দিরে সতীর গর্ভ এবং যোনি পড়েছিল। তন্ত্র সাধনার অন্যতম পীঠ এই মন্দির। প্রতি বছর অম্বুবাচীর তিন দিন কামাক্ষ্যা মন্দিরে বিশেষ উৎসব এবং মহা মেলার আয়োজন হয়। দেশ- বিদেশ থেকে ভক্তেরা ভিড় জমান মন্দিরে। তবে বন্ধ থাকে মন্দিরের দ্বার।
অম্বুবাচীর সময় তারাপীঠ মন্দির
অম্বুবাচীর সময়ে বছরের অন্যান্য দিনের মতোই তারাপীঠ মন্দিরে চলে মা তারার পুজো। এমনকী ভক্তদের জন্যেও খোলা থাকে মন্দিরের দ্বার। অনেকে ভুল করলেও, আসলে তারাপীঠ সতীপীঠ নয়। এটি একটি সাধনা স্থল বা সাধন ক্ষেত্রে বলে মনে করা হয়। এজন্যে পুরাকাল থেকে তারাপীঠ মন্দির অম্বুবাচীর সময়ও খোলা থাকে এবং নিত্য পুজো, ভোগ, আরতি সমস্ত কিছুই হয়।
অম্বুবাচীর নিয়মকানুন
শুধু কামাখ্যা নয়, অম্বুবাচী চলাকালীন বিভিন্ন মন্দির ও বাড়ির ঠাকুর ঘরের মাতৃ শক্তির প্রতিমা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। অম্বুবাচীর সময় বিধবা মহিলারা 'অশুচি' পৃথিবীর উপর আগুনের রান্না করে কিছু খান না। বিভিন্ন ফলমূল খেয়ে এই তিন দিন কাটাতে হয়। এখনও বিভিন্ন পরিবারের বয়স্ক বিধবা মহিলারা তিন দিন ধরে অম্বুবাচী উপলক্ষ্যে ব্রত পালন করেন৷
অম্বুবাচীর সময় অনেক নিয়মকানুন মানা হয়। তবে কোন কোন নিয়ম ঠিক, তা নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। সঠিক নিয়ম জানালেন প্রবীণ পুরোহিত সৈকত কুমার। তিনি জানাচ্ছেন অনেক নিয়ম থাকলেও বাড়ির সংসারী মানুষের পক্ষে সবটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মানা সম্ভব হয় না। তবে কিছু নিয়ম মানতেই হয় বছরের এই সময়ে।
* পুরোহিত জানাচ্ছেন, এই মাতৃ শক্তির মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়ার নিয়ম, ছবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। বাড়ি বা মন্দিরে মূর্তি থাকলে অবশ্যই চাপা দিতে হয়। ছবি না ঢাকলেও চলে। এর কারণ হল, বিশ্বাস অনুযায়ী, মূর্তিতেই শুধুমাত্র দেব-দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, ছবিতে নয়।
* তবে মূর্তির সামনেও নিয়মিত ভোগ দিতে হবে। সিংহাসন ছোঁয়ার দরকার নেই। নিচে জলের সঙ্গে বাতাসা, নকুলদানা, সন্দেশ, সেটা খুশি দেওয়া যায়। সেই সঙ্গে, ধূপ- ধুনো- প্রদীপ জ্বালানো যায়, তবে এক্ষেত্রেও মাতৃশক্তি আছেন, সেই সিংহাসন না ছুঁয়ে। তবে ফুল, বেলপাতা, তুলসী পাতা এসব দেওয়া যাবে না। যদি একটা সিংহাসনে সব দেব- দেবী থাকেন, তাহলে অম্বুবাচী শুরুর আগে সেই মূর্তি বা ছবি অন্যত্র রাখতে হবে।
* বাড়িতে বা মন্দিরে মা তারার ছবি বা মূর্তি থাকলে, সেটা ঢাকবেন না। নিত্য পুজো যেমন হয়, সেভাবেই করতে হয় এই সময়ও।
* যারা দেবী লক্ষ্মীর মূর্তি এই সময় ঢেকে রাখতে চান, লাল কাপড় সব বস্ত্র চাপা দেবেন। তারা বৃহস্পতিবার মা তারার ছবির সামনে পাঁচালি পড়তে পারেন। তারা মাকেই লক্ষ্মী রূপেই পুজো করতে হবে। দেবী তারাই হচ্ছে বিশালক্ষ্মী। কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোয় তারাপিঠে, মা তারাই লক্ষ্মীর রূপে পূজিতা হন। সেক্ষেত্রে মা তারার ছবির সামনেই ঘট স্থাপন করতে হবে।
* বৃহস্পতিবার দিন মা তারার সামনে এক বাটি দুধ ও একটা আম খোসা ছাড়িয়ে কেটে দিতে পারেন। এছাড়া আখের রস, ডাবের জল ভোগে দেওয়া শুভ।
* অম্বুবাচী চলাকালীন ঠাকুরের নাম জপ করতে পারেন বিধবারা। এই সময় ঠাকুরের নাম জপটা করা ভাল।
অম্বুবাচী নিবৃত্তির পরে নিয়ম
অম্বুবাচীর সমাপ্তি হলে অর্থাৎ শুরুর দিন তিনদিন পরে ১০ আষাঢ়, জামাকাপড়, বিছানা সাবান দিয়ে ধুয়ে, নিজেরা সাবান- শ্যাম্পুতে স্নান করে সব কিছুতে হাত দিতে হয় বিধবা মহিলাদের। কামাখ্যা সহ সমস্ত সতীপীঠ এবং মন্দিরের দ্বার খুলে দেওয়া হয়।