
ভারতীয় অনেক উৎসবের মধ্যে সকলের পছন্দের তালিকায় প্রথমের দিকেই থাকে দোলযাত্রা (Dolyatra) বা হোলি (Holi)। এটি এমন একটি উৎসব, যা ভারতবর্ষের বেশিরভাগ স্থানেই পালন করা হয় মহা সমারোহে। হোলি ভারত উপমহাদেশে বসন্তের আগমন, শীতের অবসান এবং প্রেমের প্রস্ফুটনকে চিহ্নিত করে।
সাধারণত ফাল্গুন মাসেই হয় দোল উৎসব। এই উৎসবের মাধ্যমে রাধা-কৃষ্ণের শাশ্বত ও ঐশ্বরিক প্রেম উদযাপন করা হয়। দোল পূর্ণিমা হিন্দু ধর্মের জন্যে খুব শুভ বলে মনে করা হয়। এদিন রাধা-কৃষ্ণের পুজো করা হয় বিশেষত। জেনে নিন দোলযাত্রার নির্ঘণ্ট।
২০২৬-র দোল ও হোলির দিনক্ষণ
এবছর দোলযাত্রা পড়েছে ৩ মার্চ (বাংলায় ১৮ ফাল্গুন)। এই দিনটিকে বসন্ত উৎসবও বলা হয়। হোলি সাধারণত দোলের পরের দিন পালিত হয়। এবছর হোলি উৎসব পড়েছে ৪ মার্চ।
দোল পূর্ণিমা কতক্ষণ থাকছে?
২ মার্চ সন্ধ্যা ৫/৪২ মিনিট থেকে ৩ মার্চ বিকেল ৪/৫৭ মিনিট পর্যন্ত এই বছর পূর্ণিমা থাকবে।
দোলযাত্রা ও হোলি
বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীনীদের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। দোল উপলক্ষে শ্রীকৃষ্ণের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত মথুরা ও রাধার জন্মস্থান বৃন্দাবনে প্রায় ১৬ দিন ধরে বিশেষ উৎসব পালিত হয়। সেই সঙ্গে দেশব্যাপী আরও একাধিক স্থানে সকলে মেতে ওঠেন রঙের উৎসবে।
হোলি উৎসব হল একটি প্রাচীন হিন্দু উৎসব যার নিজস্ব সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে, যা গুপ্ত যুগের আগে উদ্ভূত হয়েছিল। নারদ পুরাণ এবং ভবিষ্য পুরাণের মতো প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে আরও বিশদ বিবরণ সহ জৈমিনীর পূর্ব মীমাংসা সূত্র এবং কথক- গৃহ্য - সূত্রের মতো রচনাগুলিতে রঙের উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজা হর্ষের সপ্তম শতাব্দীর রচনা রত্নাবলীতেও 'হলিকোৎসব' উৎসবের উল্লেখ করা হয়েছে। এটি দণ্ডীর দশকুমার চরিত পুরাণে এবং কবি কালিদাস চতুর্থ শতাব্দীর দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের কোথায় বিশেষভাবে পালন হয় দোলযাত্রা?
শান্তিনিকেতন: শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্ত উৎসব চালু করেছিলেন। তাই রঙিন এই উৎসবের দিকে মুখিয়ে থাকেন অনেকেই। সমগ্র শান্তিনিকেতনবাসী তো বটেই, সেই সঙ্গে বিশেষ উৎসব হয় কবিগুরুর বিশ্বভারতীতে। আবিরের রঙে আরও বেশি করে রঙিন হয়ে ওঠে রাঙা মাটির দেশ। বিশ্বভারতীর বসন্ত উৎসব এখন সাধারণ মানুষ সামিল না হতে পারলেও, প্রতি বছর এই বসন্ত উৎসবের টানে এখানে ভিড় জমাতেন লক্ষাধিক লক্ষাধিক ট্যুরিস্ট। যদিও গত কয়েক বছরের মতো এবারও বিশ্বভারতীর বসন্ত উৎসব হচ্ছে শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার্থে।
নবদ্বীপ: এই দিনই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মতিথি বলে জানা যায়। বিশেষ উৎসব পালিত হয় হিন্দু বঙ্গ সমাজে। সর্বত্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও রাধা- কৃষ্ণের পুজো করা হয় বিশেষত। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীনীদের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই জন্যে নবদ্বীপেও আয়োজন করা হয় বিশেষ দোল উৎসবের। আবির খেলায় মেতে ওঠেন সকলে। নদীয়া জেলার এই পবিত্র স্থানেও ট্যুরিস্ট ও পুণ্যার্থীরা হাজির হন।
মায়াপুর: পবিত্র মায়াপুরের ইস্কনের মন্দিরে দেশ-বিদেশের থেকে লোকেরা আসেন দোল উৎসবে। প্রায় একমাস আগে থেকে চলে এখানে প্রস্তুতি। কৃষ্ণপ্রেমী বিদেশীরাও রঙের উৎসবে সামিল হল আনন্দ ও নিষ্ঠার সঙ্গে।
নিমদিহি: পুরুলিয়া জেলার নিমদিহিতে দোলের সময়ে বিশেষ লোক উৎসব হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে আগত ট্যুরিস্টরা লোকশিল্প উপভোগ করতে পারেন এই সময়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছৌ নাচ, দরবারি ঝুমুর, নাটুয়া নাচ, বাউল গান। মূলত বসন্তকেই উদযাপন করা হয় এই সময়ে।
মদন মোহন মন্দির : বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে মদনমোহন মন্দিরটি এই অঞ্চলে সবচেয়ে সুপরিচিত। ১৬০০ খ্রীস্টাব্দের শেষ দিকে রাজা রাজা দুর্জান সিং দেব এই মন্দিরের নির্মাণ করেছিলেন। হিন্দু ধর্মীয় বই, রামায়ণ এবং মহাভারত ইত্যাদি মন্দিরের দেয়ালগুলিতে খোদাই করা আছে। শ্রীকৃষ্ণ ও রাধাকে সম্মান জানাতে এই মন্দির তৈরি হয়েছিল। তাই প্রতি বছর দোলযাত্রায় এখানে বিশেষ উৎসব পালিত হয়।