
পুরীর (Puri) জগন্নাথধামে (Jagannath Dham) সারা বছর জুড়েই দেশ- বিদেশ থেকে ভক্তদের সমাগম হয়। জগন্নাথ মহাপ্রভুর দর্শনে ভিড় জমান লক্ষ লক্ষ মানুষ। ওড়িশার সমুদ্রসৈকতের পাশে অবস্থিত প্রভু জগন্নাথের মন্দির (Jagannath Temple) সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছে। এর কারণ হল মন্দিরের রত্নভাণ্ডার। মন্দিরের এই রত্নভাণ্ডারটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন ধাপে এই তদন্তকার্য পরিচালিত হচ্ছে। এই অসাধারণ আবিষ্কারটি মন্দিরের চারপাশের রহস্যগুলোকে আরও গভীর করে তুলেছে।
জগন্নাথ মন্দির
পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরটি ভারতের চার ধামের (চারটি পবিত্র তীর্থস্থান) অন্যতম। এই মন্দিরে ধুমধাম করে রথযাত্রার উৎসব পালিত হয় পুরীতে। পুরাণ অনুসারে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রভু বিষ্ণুর আশীর্বাদ লাভ করার পর এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। কথিত আছে যে, প্রভু স্বপ্নে তাঁকে নীল মাধবের সন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আবার আরও একটি প্রচালিত বিশ্বাস অনুসারে, পাণ্ডবরা যখন যমরাজের উদ্দেশ্যে তাঁদের অন্তিম যাত্রায় বেরিয়েছিলেন, তখন 'সপ্ত ঋষি' তাঁদের মোক্ষলাভের জন্য চার ধাম দর্শনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। পুরীর জগন্নাথ মন্দির হল সেই পবিত্র স্থানগুলোরই একটি। সেসময় থেকে মন্দিরের অনেক প্রথা ও ঐতিহ্য অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। যার মধ্যে প্রভু জগন্নাথের বিগ্রহ বা মূর্তির সঙ্গে জড়িত কিছু বিশ্বাসও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, এই মন্দিরটি এমন অনেক বিষয়ের জন্য পরিচিত, যা সাধারণ বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্ককে হার মানায়। জানুন,পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অজানা রহস্য।
লাল পতাকার রহস্য
মন্দিরের চূড়ায় সর্বদা একটি লাল পতাকা ওড়ে। এটি হয়তো আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ প্রথা বলেই মনে হতে পারে, কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হল—এই পতাকা সর্বদা বাতাসের বিপরীত দিকে ওড়ে। সব সময়ই এই ঘটনাই ঘটে। অনেকেই এটাকে ঈশ্বরের কোনও সংকেত হিসেবে মনে করেন-যেন তিনি এমন কোনও বার্তা দিচ্ছেন, যা পুরোপুরি অনুধাবন করা মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। এই প্রথাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি বিশেষ ঐতিহ্য। প্রতিদিন একজন পুরোহিত কোনও রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই মন্দিরের প্রায় ২০০ ফুট উঁচু চূড়ায় আরোহণ করেন এবং সেই পতাকাটি পরিবর্তন করেন। এমন বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, যদি কোনও দিন এই আচারট পালন করা না হয়, তবে মন্দিরটি হয়তো বহু বছরের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সমুদ্রের গর্জন মন্দিরে প্রবেশ করলেই মিলিয়ে যায়
জগন্নাথ মন্দিরটি সমুদ্র থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, মন্দিরের মূল প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়। আবার যেই বাইরে পা রাখা মাত্রই সেই শব্দ পুনরায় শোনা যায়। একারণেই ভক্তরা বলে যে, এটি কেবল একটি মন্দির নয়, বরং এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবান হনুমানকে এই মন্দির রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল; তিনি সমুদ্রের গর্জন স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন, যাতে প্রভু জগন্নাথ শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারেন।
প্রসাদ নিবেদনের অনন্য রীতি
এখানে প্রতিদিন সাতটি মাটির পাত্র একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে প্রভুর প্রসাদ রান্না করা হয়। সাধারণত নিয়ম হল নিচের পাত্রের খাবার আগে রান্না হবে, কিন্তু এখানে ঘটে ঠিক তার উল্টো—সবচেয়ে ওপরের পাত্রের খাবারটিই সবার আগে প্রস্তুত হয়ে যায়। এছাড়া, দর্শনের জন্য যত মানুষই আসুক না কেন, প্রসাদ কখনও ফুরিয়ে যায় না কিংবা নষ্টও হয় না; প্রতিদিন ঠিক ততটুকু পরিমাণই প্রস্তুত হয়, যতটুকু প্রয়োজন।
মন্দিরের কোনও ছায়া পড়ে না
কথিত আছে যে, মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলী এমনভাবে নির্মিত যে, দিনের কোনও সময়েই এর ছায়া মাটিতে পড়তে দেখা যায় না। এই বিষয়টি আজও মানুষকে বিস্মিত করে।
কাঠের তৈরি অনন্য বিগ্রহসমূহ
জগন্নাথ মন্দিরের আরও এটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এখানকার বিগ্রহ বা মূর্তিগুলি। অধিকাংশ মন্দিরে যেখানে পাথর বা ধাতু নির্মিত বিগ্রহ দেখা যায়, সেখানে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার বিগ্রহগুলো তৈরি হয়েছে নিম কাঠ দিয়ে। আর এর সবচেয়ে অনন্য দিকটি হল, প্রতি ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর 'নবকলেবর' নামক এক বিশেষ ও গোপনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিগ্রহগুলো পরিবর্তন করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, এই প্রক্রিয়ার চলাকালীন 'ব্রহ্ম পদার্থ' নামক এক রহস্যময় উপাদান পুরনো বিগ্রহ থেকে নতুন বিগ্রহে স্থানান্তরিত করা হয়। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কেবল হাতে গোনা কয়েকজন পুরোহিতই প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান; বাকি সবকিছুই রহস্যের আড়ালে থেকে যায়।