
ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ মন্দির শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, নানা প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের জন্যও বিশেষ পরিচিত। তার মধ্যে অন্যতম হল 'নবকলেবর'। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভগবান জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা ও সুদর্শন চক্রের কাঠের বিগ্রহ নতুন করে নির্মাণ করা হয়। অনেকেই মনে করেন প্রতি ১২ বছর অন্তর এই প্রথা পালিত হয়। তবে বাস্তবে এটি ঠিক প্রতি ১২ বছর নয়, বছরে আষাঢ় মাসে অধিকমাস (মলমাস) পড়ে, সেই সময়ই নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়। ফলে কখনও ১২, কখনও ৮, আবার কখনও ১৯ বছর পরও এই আচার হতে পারে।
কেন বদলানো হয় বিগ্রহ?
জগন্নাথদেবের বিগ্রহ অন্য অনেক মন্দিরের দেবমূর্তির মতো পাথর বা ধাতুর নয়, নিম (দারু) কাঠ দিয়ে তৈরি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের স্বাভাবিক ক্ষয় হয়। তাই প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে নির্দিষ্ট সময়ে নতুন কাঠ দিয়ে নতুন বিগ্রহ তৈরি করা হয়।
তবে হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এখানে শুধু কাঠের মূর্তি বদলানো হয়, দেবতার চৈতন্য বা আত্মা নয়। পুরনো বিগ্রহ থেকে এক রহস্যময় পবিত্র উপাদান, যাকে 'ব্রহ্ম পদার্থ' বলা হয়, তা গোপন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন বিগ্রহে স্থানান্তর করা হয়। এই পর্বটি গভীর রাতে সম্পূর্ণ গোপনে সম্পন্ন হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন মাত্র কয়েকজন নির্দিষ্ট সেবায়েত।
কীভাবে তৈরি হয় নতুন বিগ্রহ?
নবকলেবরের আগে বিশেষ লক্ষণযুক্ত নিমগাছের খোঁজে বের হন মন্দিরের সেবায়েতরা। এই অভিযানের নাম 'বনযাগ যাত্রা'। শাস্ত্রে বর্ণিত একাধিক বিশেষ চিহ্ন, মন নির্দিষ্ট রং, শঙ্খ, চক্র, গদা বা পদ্মের মতো প্রাকৃতিক দাগ, আশপাশের পরিবেশ ইত্যাদি বিচার করে সেই গাছ নির্বাচন করা হয়।
তারপর ধর্মীয় নিয়ম মেনে সেই কাঠ দিয়ে নতুন বিগ্রহ নির্মাণ করা হয়। কাজ শেষ হলে পুরনো বিগ্রহকে মন্দির প্রাঙ্গণের কোইলি বৈকুণ্ঠে সমাধিস্থ করা হয়।
ভক্তদের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
নবকলেবরকে ভগবান জগন্নাথের 'নতুন দেহ ধারণ' হিসেবে দেখা হয়। মানুষের যেমন পুরনো শরীর ছেড়ে নতুন দেহে আত্মার যাত্রার কথা হিন্দু দর্শনে বলা হয়েছে, তেমনই জগন্নাথদেবও নতুন কাঠের দেহ ধারণ করেন, এই বিশ্বাসই নবকলেবরের মূল দর্শন।
এই বিরল অনুষ্ঠান উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরীতে ভিড় জমান। কারণ, নবকলেবর প্রত্যক্ষ করার সুযোগ জীবনে খুব কমবারই আসে।
অনেকের ধারণা, জগন্নাথদেবের বিগ্রহ প্রতি ১২ বছর অন্তর বদলানো হয়। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট ১২ বছরের নিয়ম নয়। আষাঢ় মাসে অধিকমাস পড়লেই নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়। তাই দুই নবকলেবরের ব্যবধান জ্যোতির্বিদ্যাগত গণনার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।