আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় যত এগিয়ে আসে, মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, সবার কপালেই চিন্তার ভাঁজ চওড়া হয়। বিশেষ করে সম্পত্তি বিক্রি করে যারা বড় অঙ্কের মুনাফা বা 'ক্যাপিটাল গেইন' করেছেন, তাদের রাতের ঘুম ওড়ে করের ভয়ে। কিন্তু আপনি কি জানেন, কেন্দ্রীয় সরকারের আয়কর আইনেই এমন একটি গলি রয়েছে, যা দিয়ে হাঁটলে প্রায় ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত মুনাফার ওপর আপনাকে এক পয়সা কর দিতে হবে না? শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ধারা ৫৪এফ (Section 54F) ঠিক এই জাদুর কাঠিটিই আপনার হাতে তুলে দিতে পারে।
ধরা যাক, আপনি আপনার একটি পুরনো জমি, সোনা বা শেয়ার বিক্রি করেছেন। এই সম্পদ বিক্রির পর যে টাকা আপনার হাতে এল, তাকেই বলা হয় ক্যাপিটাল গেইন। সাধারণত এই লভ্যাংশের ওপর সরকারকে মোটা অঙ্কের কর দিতে হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের বর্তমান আয়কর কাঠামো অনুযায়ী, আপনি যদি এই লভ্যাংশের টাকা নতুন কোনো বাড়ি কেনা বা তৈরির কাজে ব্যবহার করেন, তবে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে আপনি সম্পূর্ণ করছাড় পেতে পারেন। এটি মূলত সাধারণ মানুষকে আবাসন শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার একটি সরকারি প্রয়াস।
৫৪এফ ধারার সবথেকে বড় বিশেষত্ব হলো, এটি শুধুমাত্র বাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আপনি যদি বাড়ি ছাড়া অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ (Long Term Capital Assets) যেমন সোনা, বন্ড বা জমি বিক্রি করেন এবং সেই পুরো টাকাটি একটি নতুন বসতবাড়ি কিনতে ব্যয় করেন, তবেই এই ছাড়ের দাবিদার হতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, এই ছাড়ের একটি ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে। বর্তমানে এই আইনের অধীনে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের বিপরীতে করছাড় পাওয়া সম্ভব হলেও, প্রায় ৩ কোটি টাকার মুনাফা বা লভ্যাংশকে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার সুযোগ এখন বিনিয়োগকারীদের হাতের নাগালে।
তবে এই ছাড় পাওয়ার রাস্তাটি মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু কড়া শর্ত। প্রথমত, যে ব্যক্তি এই সুবিধা চাইছেন, নতুন বাড়িটি কেনার সময় তাঁর নামে যেন একটির বেশি বসতবাড়ি না থাকে। অর্থাৎ, আপনার যদি ইতিমধ্যেই শহরে দুটি বাড়ি থাকে এবং আপনি তৃতীয়টি কেনার জন্য এই ছাড় চান, তবে আয়কর দফতর আপনার আবেদন খারিজ করে দেবে। এটি মূলত সেই সমস্ত মানুষের জন্য যারা সম্পদ বিক্রি করে নিজের মাথার ওপর একটি স্থায়ী ছাদ নিশ্চিত করতে চাইছেন।
সময়ের হিসেবটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পদ বিক্রির এক বছর আগে অথবা বিক্রির দুই বছরের মধ্যে আপনাকে নতুন বাড়িটি কিনতে হবে। আর আপনি যদি বাড়িটি নিজে তৈরি করতে চান, তবে হাতে পাবেন তিন বছর সময়। এই সময়সীমার এক চুল এদিক-ওদিক হলেই আপনার ৩ কোটি টাকার ছাড় পাওয়ার স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, বাড়ি কিনতে দেরি হচ্ছে, সেক্ষেত্রে সেই টাকাটি 'ক্যাপিটাল গেইন অ্যাকাউন্ট স্কিম'-এ জমা রাখলে করের হাত থেকে সাময়িক রেহাই পাওয়া যায়।
২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে এই ধারায় কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। আগে এই করছাড়ের কোনও সীমা ছিল না, কিন্তু এখন ১০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায় না। তবুও মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের জন্য ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ট্যাক্স বাঁচানো একটি বিশাল প্রাপ্তি। বিশেষ করে যারা পৈতৃক জমি বা পুরনো গয়না বিক্রি করে নতুন ফ্ল্যাট বুক করার কথা ভাবছেন, তাদের জন্য ৫৪এফ ধারাটি এক প্রকার সঞ্জীবনী সুধা।
সতর্ক থাকতে হবে বাড়ির মালিকানা নিয়েও। নতুন কেনা বাড়িটি যদি আপনি তিন বছরের মধ্যে বিক্রি করে দেন, তবে যে করছাড় আপনি পেয়েছিলেন, তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, সরকার আপনাকে বাড়ি কেনার সুযোগ দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই বাড়ি নিয়ে ব্যবসা করার অনুমতি দিচ্ছে না। নিয়ম ভাঙলে পুরনো সব কর আবার সুদে-মূলে ফেরত দিতে হবে। তাই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখেই এই পথে এগোনো বুদ্ধিমানের কাজ।
পরিশেষে বলা যায়, আয়কর আইনের জটিল প্যাঁচে না জড়িয়ে একটু সচেতন হলেই কোটি কোটি টাকা ট্যাক্স সাশ্রয় সম্ভব। ৫৪এফ ধারাটি সেই সমস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় হাতিয়ার, যারা তাদের সম্পদকে সুরক্ষিতভাবে স্থাবর সম্পত্তিতে রূপান্তর করতে চান। তবে এই বড় অঙ্কের ছাড় পাওয়ার আগে অবশ্যই একজন পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, ৩ কোটি টাকার ট্যাক্স বাঁচানোর খেলায় ছোট একটি ভুলও আপনাকে আয়কর দপ্তরের কড়া নোটিশের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।