
গাড়ি কেনাকে এক সময় নিজের আর্থিক সামর্থ্যের প্রতীক বলে মনে করা হতো। তবে এখন অ্যাপ ক্যাবের বাড়বাড়ন্ত। আবার গাড়ির দামও বেড়েছে। তেলের খরচও। ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, গাড়ি কেনা নাকি অ্যাপ ক্যাবে চড়া বেশি সাশ্রয়ী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরটি নির্ভর করছে শুধু গাড়ি কেনার সামর্থ্যের উপর নয়, বরং গাড়িটি কতটা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার মোট মালিকানা ব্যয়ের উপর।
২০ লক্ষের গাড়ি রাখতে মাসে কত খরচ?
ধরা যাক, আপনি ২০ লক্ষ টাকার একটি গাড়ি কিনলেন। সেক্ষেত্রে যদি ৪ লক্ষ টাকা ডাউন পেমেন্ট করেন তাহলে বাকি টাকার জন্য পাঁচ বছরের ঋণ নিলে মাসিক EMI দাঁড়াতে পারে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা।
যদি প্রতিদিন ৫০-৭০ কিলোমিটার যাতায়াত করেন, তাহলে শুধু জ্বালানির খরচই মাসে হবে প্রায় ২০,০০০ টাকা মতো। এর সঙ্গে যোগ হবে বিমা, সার্ভিসিং, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ার বদলানো এবং অন্যান্য মেরামতের খরচ। সব মিলিয়ে মাসে আরও ৫,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকা ব্যয় হতে পারে।
পার্কিংও বড় খরচ
মুম্বই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, গুরুগ্রাম, কলকাতা বা নয়ডার মতো শহরে আবাসন, অফিস বা শপিং মলে পার্কিংয়ের জন্য আলাদা টাকা গুনতে হয়। অনেক সময় পার্কিং খুঁজতে গিয়েও অতিরিক্ত সময় নষ্ট হয়, যা পরোক্ষভাবে আরও একটি খরচ।
মূল্য কমে যাওয়াও বড় ক্ষতি
শোরুম থেকে বের হওয়ার মুহূর্ত থেকেই নতুন গাড়ির দাম কমতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুনর্বিক্রয় মূল্য বা রিসেল ভ্য়ালু কমে যায়। এটি মাসিক খরচ না হলেও গাড়ির মালিকানার অন্যতম বড় আর্থিক ক্ষতি। তাহলে সব মিলিয়ে ২০ লক্ষ টাকার একটি গাড়ির মাসিক মোট খরচ প্রায় ৬০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
নিজের গাড়ি বনাম রাইড-হেইলিং
অন্যদিকে, কোনও শহুরে কর্মজীবী ব্যক্তি যদি অফিস যাতায়াত, বিমানবন্দর, ক্লায়েন্ট মিটিং, সপ্তাহান্তের বেড়ানো এবং মাঝেমধ্যে শহরের বাইরে যাওয়ার জন্য প্রিমিয়াম ক্যাব পরিষেবা ব্যবহার করেন, তাহলে তাঁর মাসিক খরচ প্রায় ৪০,০০০ টাকা হতে পারে। এক্ষেত্রে EMI, বিমা, সার্ভিসিং, হঠাৎ মেরামত, পার্কিং কিংবা গাড়ির মূল্য কমে যাওয়ার মতো খরচ থাকে না। অর্থাৎ, গাড়ি সারাদিন দাঁড় করিয়ে রাখার বদলে যতটা প্রয়োজন, ততটাই যাতায়াতের জন্য খরচ করতে হয়।
সবার জন্য একই সিদ্ধান্ত নয়
Vibhavangal Anukulakara Pvt. Ltd.-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর সিদ্ধার্থ মৌর্য বলেন, এখন গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত শুধু সামর্থ্যের বিষয় নয়, বরং আর্থিক দক্ষতা এবং জীবনযাত্রার প্রয়োজনের উপর নির্ভর করে।
তাঁর মতে, অনেকেই শুধু EMI-র দিকে নজর দেন। কিন্তু জ্বালানি, বিমা, রক্ষণাবেক্ষণ, পার্কিং, গাড়ির মূল্যহ্রাস এবং গাড়িতে আটকে থাকা মূলধনের সুযোগ ব্যয়ের মতো বিষয়গুলি হিসাব করেন না। অনেক মেট্রো শহরে এই মোট ব্যয় প্রিমিয়াম ক্যাব ব্যবহারের খরচের থেকেও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের প্রতিদিন গাড়ির প্রয়োজন হয় না।
তবে তিনি এটাও জানান, সব মানুষের জন্য একই সমাধান নেই। যাঁদের পরিবার রয়েছে, সন্তানদের নিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়, প্রায়ই শহরের বাইরে যেতে হয়, অদ্ভুত সময়ে কাজ করতে হয় বা যেখানে গণপরিবহন সীমিত- তাঁদের জন্য নিজের গাড়ি এখনও সুবিধাজনক এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে।
কী দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, গাড়ি কেনার আগে শুধু সামাজিক মর্যাদা বা শখের কথা না ভেবে এই বিষয়গুলি বিবেচনা করা উচিত। বরং দেখা দরকার, বছরে কত কিলোমিটার গাড়ি চালাবেন, প্রতিদিনের যাতায়াতের প্রয়োজন, পার্কিংয়ের খরচ এবং গাড়ি কেনা আপনার সামগ্রিক আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা মানানসই।
অর্থাৎ গাড়ি কিনবেন নাকি অ্যাপ ক্যাবে যাবেন সেটা নির্ভর করবে আপনার ব্যবহার ও প্রয়োজনের উপর। যাঁরা প্রতিদিন গাড়ি ব্যবহার করেন বা পারিবারিক কারণে নিয়মিত গাড়ির প্রয়োজন হয়, তাঁদের জন্য গাড়ি কেনা এখনও যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তবে যাঁরা মাঝেমধ্যে গাড়ি ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্যাব পরিষেবা ব্যবহার করাই তুলনামূলকভাবে বেশি সাশ্রয়ী এবং সুবিধাজনক।