
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হতেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করেছে ইরান। এমতাবস্থায় কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে ভারত। কারণ এই প্রণালী দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ভারতে তেলের সংকট দেখা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ফের একবার প্রশ্ন উঠেছে 'চিনের সঙ্গে নতুন রেলপথ' নিয়ে। অনেকেই দাবি করেন, এই রেলপথ ধরে তেল ইরানে আনা হলে, সেখান থেকে ভারতে আনা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আদৌ কি ইরান থেকে চিনে তেল আনা সম্ভব?
চিন-ইরান রেলপথ কী?
সবার আগে বুঝে নিতে হবে যে চিন ও ইরানের রেলপথের মধ্যে কিন্তু কোনও নতুন রেলপথ তৈরি করা হয়নি। বরং সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যেতে পারে এটি একটি রেল করিডর, যা মূলত মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে।
চিনের স্টেট কাউন্সিল ইনফরমেশন অফিস (SCIO)-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, একটি মালবাহী ট্রেন ১৪ দিনের যাত্রা শেষে তেহরানে পৌঁছায়। ট্রেনটি কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যেকার রেললাইন ব্যবহার করে প্রায় ১০,৩৯৯ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে চিনের ইইউ শহর থেকে কনটেইনারে করে পণ্য নিয়ে এসেছিল। অর্থাৎ এটি কোনও নতুন কোনও প্রজেক্ট নয়, বরং বহু দেশের রেলপথ মিলিয়ে তৈরি একটি কানেকশন।
কেন এই করিডর আবার আলোচনায় উঠে এসেছে?
২০১৬ সালে চালু হওয়ার পর কোভিড-১৯ এর সময় এই পরিষেবা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে পুনরায় এই করিডর চালু হয়। ইরানের সংবাদমাধ্যমেও তা ব্যাপক প্রচার পায়।
এরপরে ২০২৫ সালের জুন মাসে ইজরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় আবার এই করিডর আলোচনায় উঠে আসে। তখন অনেকেই এই করিডরকে সমুদ্রপথের বিকল্প কৌশলগত পথ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন।
রেল গেজের মধ্যে পার্থক্য বড়সড় চিন্তা
দুই লাইনের মাঝের দূরত্বকে রেল গেজ বলা হয়। এই রেল গেজ চিন-ইরান রেল করিডরের পথে বড় বাধা। আসলে চিন ও ইরান মূলত ব্যবহার করে স্ট্যান্ডার্ড গেজ (১,৪৩৫ মিমি)। অন্যদিকে, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশ ব্যবহার করে ১,৫২০ মিমি গেজ। এরফলে এই দুই ধরনের লাইন যেখানে মেশে, সেখান থেকে ট্রেন যেতে পারে না। এক্ষেত্রে দুটি রাস্তা থাকে। প্রথমটি হল, মাল আনলোডিং করে অন্য গেজের ওয়াগনে সরিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয়টি হল, ট্রেনের বগির চাকা বদলানো।
এক্ষেত্রে চিন-ইরান করিডরে অন্তত চারটি এমন গেজ পরিবর্তন পয়েন্ট রয়েছে। এর ফলে প্রতিবার সীমান্তে ট্রেন থামাতে হয় এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এগোতে পারে না।
ইরানের রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের রেল নেটওয়ার্ক তুর্কমেনিস্তান ও অন্যান্য সিআইএস দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুটি সীমান্ত স্টেশনে। সারাখস ও ইঞ্চে বুরুনে। এই দুটি জায়গাতেই গেজ পরিবর্তন করতে হয়। ফলে শুধু সময় নষ্ট হয় না, বরং প্রতিদিন কত মাল পরিবহন করা যাবে তারও একটি কঠোর সীমা তৈরি হয়। কারণ, প্রতিটি স্টেশনেই ওয়াগনের বগি বদলানোর সীমা থাকে। ইরান রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারাখস স্টেশনে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪০০টি ওয়াগনের বগি বদলানো যায়। এটাই কার্যত পুরো করিডরের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।
রেলে তেল পরিবহনের হিসাব কী বলছে?
রেলপথে ট্যাঙ্ক ওয়াগনের মাধ্যমে তেল পরিবহন করা সম্ভব। কিন্তু এখানে আসল প্রশ্ন হল পরিমাণ। একটি আধুনিক চার-অ্যাক্সেলের ট্যাঙ্ক ওয়াগনে সাধারণত প্রায় ৬৬ টন তেল বহন করা যায়। রাষ্ট্রসংঘের স্ট্যাটিস্টিক্স অনুযায়ী, ১ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেলের অর্থ ৭.৩২ ব্যারেল তেল। সারাখস স্টেশনের সীমা ধরে হিসাব করলে অঙ্কটা দেখা যাচ্ছে -
৪০০ ওয়াগন × ৬৬ টন × ৭.৩২ ব্যারেল
= ১,৯৩,০০০ ব্যারেল প্রতিদিন
অর্থাৎ প্রায় ০.২ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন।
সংখ্যাটি একেবারে তুচ্ছ নয়, কিন্তু বৈশ্বিক তেল পরিবহনের তুলনায় খুব বড়ও নয়। ফলে এই আমদানিতে খরচ বেশি পড়ে। অন্যদিকে, সমুদ্রপথে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা যায়, ফলে প্রতি ইউনিট পরিবহন খরচ কম পড়ে।
অন্যদিকে আবার, চিন থেকে ইরান যাওয়ার পথে একাধিক ট্রানজিট দেশ রয়েছে। যাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব আইন ও কূটনৈতিক অবস্থান রয়েছে। তার উপর আবার রেল গেজ পরিবর্তনের কারণে নির্দিষ্ট সীমান্ত ইয়ার্ডে ট্রেন থামতেই হয়। ফলে মালপত্র জমা হওয়ার জায়গাগুলো আগেই নির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আগে থেকে নির্ধারিত কোনও জায়গায় ট্রেন থামলে তা নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গোটা আলোচনার কী নির্যাস পাওয়া গেল?
আজ যে ব্যবস্থা রয়েছে তা মূলত মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রেল নেটওয়ার্ককে যুক্ত করা একটি কার্যকর মালবাহী করিডর। এর মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করা যেতে পারে, বাণিজ্যের একটি অতিরিক্ত রাস্তাও হতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে পরিবহন সময়ও কমতে পারে। কিন্তু তেলের ক্ষেত্রে সমুদ্র পথের বিকল্প হতে পারে না এই রুট। এক্ষেত্রে মানচিত্র যতটা সহজ দেখাচ্ছে, বাস্তবে রেলপথের লজিস্টিকস তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।