
এক লাফে ২০ শতাংশ ডিএ বাড়িয়েছে রাজ্য সরকার। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে সরকারি কর্মীদের ডিএ পেতে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। আদালতের দ্বারস্থ তো হয়েছিলেনই, আবার রাস্তায় নেমেও মিছিল-আন্দোলন করেছিলেন সরকারি কর্মীরা। তারপরও সেই জমানায় ১৮ শতাংশের বেশি মহার্ঘ ভাতা জোটেনি। তবে আগামী অক্টোবর থেকে ৩৮ শতাংশ ডিএ পাবেন তাঁরা। আজ রাজ্য বাজেটে এই ঘোষণা করেছেন বিজেপি পরিচালিত সরকারের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেও ডিএ বৃদ্ধির প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। বলেন, 'এই সরকার কর্মীদের সঙ্গে নিয়েই চলবে। যা বকেয়া আছে তা মেটানোর কাজ শুরু হয়েছে। বাকিটাও দেওয়া হবে। শুধু সরকারকে একটু সময় দিতে হবে। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভিক্ষা দেওয়ার মতো ২ থেকে ৩ শতাংশ দিয়েছিলেন। কেন্দ্রের সঙ্গে যে ২২ শতাংশের গ্য়াপ থাকল সেটাও ধীরে ধীরে দেব। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তর আর একটা বাজেট পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সপ্তম বেতন কমিশনের কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সহযোগিতা করুন। আমি লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছি ডিসেম্বর পর্যন্ত। সব ঠিক থাকলে জানুয়ারি মাসেই সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করে দেব। আর এটা হয়ে গেলে অষ্টম বেতন কমিশনের বিষয়টাও বিবেচনার সঙ্গে দেখব।'
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুশি সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ বা সরকারি কর্মচারী পরিষদ। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ। তাদের দাবি, সরকার প্রতারণা করছে। ডিএ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়িত করেননি। প্রসঙ্গত, এই তিন সংগঠনই ডিএ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়েছিল। আবার নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবিতে রাজপথে নেমেও সরব হয়েছিল।
আজ সরকারের ডিএ ঘোষণা নিয়ে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের তরফে ভাস্কর ঘোষ বলেন, 'সংগ্রামী যৌথমঞ্চ যে যে দাবি করেছিল, তার সব পূরণ হয়নি,সেটা নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা হবে। সরকার নিয়োগের ঘোষণা করেছে। ডিএ ঘোষণা করেছে। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে থেকেছেন। আন্দোলনে ছিলেন। ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করেছেন। আমরা খুশি যে সরকার অনেক দাবি মেনে নিয়েছে। তবে দর কষাকষি হবে। তবে নয়া মুখ্যমন্ত্রী প্রমাণ করে দিয়েছেন, সদিচ্ছা থাকলে অনেক কিছু হয়।'
সরকারি কর্মচারী পরিষদের সভাপতি দেবাশিস শীল বলেন, 'এর আগেই চার সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেদিনই তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন্দ্র ও রাজ্যের ডিএ-র যে ব্যবধান তা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনবেন। সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রাখলেন। যদিও অক্টোবর থেকে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। সেটা একটু দেরি হয়ে গেল। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়ে যে ধোঁয়াশা ছিল, সেটারও নিরসণ করেছেন। জানিয়েছেন সবাই পাবেন। ৪ মাস পর থেকে বর্ধিত ডিএ দেওয়া শুরু করলেও এই সিদ্ধান্ত অভূতপূর্ব। একসঙ্গে ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি কোনওদিন হয়নি। আমরা রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা আশাবাদী, এই সরকারের আমলে কর্মীরা ভালো থাকবেন।'
এদিকে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজের মলয় মুখোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠকে এই মুখ্যমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা রাখেননি। তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। তাঁর কথায়, 'সেদিনের বৈঠকে চার সংগঠনের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বাজেটে ভালো খবর দেবেন ও ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বেতন কমিশন হবে। এর আগের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় ৪ শতাংশ ডিএ ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। সেই ডিএ যদি শুভেন্দু অধিকারীর সরকার দিত, তাহলে আগে থেকেই কর্মীরা বেশি টাকা হাতে পেতেন। তা না করে সেই ৪ শতাংশের সঙ্গে ১৬ শতাংশ যোগ করে অক্টোবর মাসে নিয়ে চলে গেলেন। তাহলে নয়া সরকারের আমলে আমরা তো অক্টোবর পর্যন্ত শূন্য শতাংশ ডিএ পেলাম। এটা প্রবঞ্চনার সামিল।'
অক্টোবর থেকে এই সরকারের নতুন হারে ডিএ দেওয়ার যে দাবি তার পিছনেও চক্রান্ত রয়েছে বলে দাবি করেন মলয় মুখোপাধ্যায়। বলেন, 'অক্টোবর থেকে ৩৮ শতাংশ ডিএ দিলেও আরও ২২ শতাংশ বাকি থাকবে। তাহলে তো ২০২৭ থেকে বেতন কমিশন হবে না। কারণ তিনি তো বলছেন বাকি বকেয়ার জন্য পরবর্তী বাজেট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অথচ উনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বেতন কমিশন হবে। তাহলে তো সেটা মিথ্যা। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা কোনও সরকারকে বন্ধু বলে মনে করি না। এই সরকারকেও মনে করছি না। সব সরকারই সমান। যা মমতা তাই শুভেন্দু। সিপিএমও একই ছিল। তখনও আন্দোলন করেছি। অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য যা যা করণীয়, এবারও করব।'