
সরকারের ৩১,৫০০ কোটি টাকার LIC শেয়ার বিক্রি: সময় জানতেন না অনেক ব্যাংকারও, কীভাবে গোপনে হল ভারতের সবচেয়ে বড় সেকেন্ডারি শেয়ার বিক্রি
ভারতীয় জীবন বিমা সংস্থায় থাকা নিজেদের শেয়ারের ৬.৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে কেন্দ্র সরকার। এর মূল্য প্রায় ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
LIC-এর শেয়ার বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই গোপনীয়তার সঙ্গে করা হয় যে, লেনদেনের ক্ষেত্রে সরকারের পরামর্শদাতা হিসেবে থাকা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কের কর্মকর্তারাও আগাম কিছুই জানতে পারেননি।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেয়ার বিক্রি শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কারকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়। কেন ডাকা হয়েছে, সেটিও তাঁকে জানানো হয়নি। অফিসে পৌঁছানোর পর তাঁকে জানানো হয়, সেদিন সন্ধ্যাতেই LIC-র শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং তাঁকে অবিলম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়ার নথি প্রস্তুত করতে বলা হয়।
কেন এত গোপনীয়তা?
সরকার ইচ্ছাকৃতভাবেই এই শেয়ার বিক্রির সময়সূচি গোপন রেখেছিল। আশঙ্কা ছিল, বাজারে আগাম খবর ছড়িয়ে পড়লে বড় বিনিয়োগকারী বা ট্রেডাররা আগে থেকেই অবস্থান তৈরি করে LIC-র শেয়ারের দামের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। ফলে পুরো পরিকল্পনা ছিল 'নিড-টু-নো' ভিত্তিতে। অর্থাৎ, যাঁদের জানানো একান্ত প্রয়োজন, কেবল তাঁরাই তথ্য পেয়েছিলেন।
ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে যুক্ত চারটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ককেও একসঙ্গে সব তথ্য দেওয়া হয়নি। একজন ব্যাঙ্কার স্টক এক্সচেঞ্জে ঘোষণা করার ঠিক আগে বিষয়টি জানতে পারেন। আরেকজনকে শেষ মুহূর্তে DIPAM অফিসে ডেকে পুরো পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। সরকারের একটি ছোট দলই শুধু জানত, ঠিক কখন এই শেয়ার বিক্রি শুরু হবে।
এদিকে LIC-র এই শেয়ার বিক্রির ফলে সাধারণ গ্রাহক বা পলিসি হোল্ডারদের মনে প্রশ্ন আসতে শুরু করে, কেন এত গোপনীয়তা? অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, LIC-র শেয়ার বিক্রি হওয়ার ফলে সাধারণ পলিসি হোল্ডারদের দৈনন্দিন জীবনে কোনও প্রভাব পড়ার কথা নয়। কারণ সরকার LIC-কে বেসরকারিকরণ করেনি, বরং নিজের মালিকানার একটি অংশ বিক্রি করেছে।
অর্থাৎ পলিসি আগের মতোই চালু থাকবে। জীবনবিমার শর্ত, প্রিমিয়াম, ম্যাচুরিটি, বোনাস বা ক্লেমের নিয়ম এই শেয়ার বিক্রির কারণে বদলাবে না। সরকার এখনও LIC-র সবচেয়ে বড় মালিক। ৬.৫% শেয়ার বিক্রির পরও সরকারের হাতে প্রায় ৯০% শেয়ার রয়েছে। ফলে LIC-র উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে। ক্লেম পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও পরিবর্তন হবে না। বৈধ দাবি থাকলে আগের নিয়মেই নিষ্পত্তি হবে।
পরোক্ষভাবে কি প্রভাব পড়তে পারে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারের নজরদারি বাড়বে। তালিকাভুক্ত সংস্থা হিসেবে লাভজনকতা ও পরিষেবার মান উন্নত করার চাপ বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার, শেয়ারদামের ওঠানামা পলিসির সঙ্গে সম্পর্কীত নয়। LIC-র শেয়ারের দাম কমা বা বাড়া মানেই পলিসির মূল্য বা সুবিধা কমে-বাড়ে না।
কীভাবে ২.৫% থেকে ৬.৫% হল?
শেয়ার বিক্রির সময় সরকার প্রথমেই পুরো শেয়ার বিক্রি না করে মাত্র ২.৫ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়ে। পাশাপাশি আরও ৪ শতাংশ অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রির বিকল্প খোলা রাখা হয়। এই কৌশলের উদ্দেশ্য ছিল, প্রথম পর্যায়ে চাহিদা বেশি দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করা। সেই পরিকল্পনা সফল হয়। মঙ্গলবার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ৩.৩২ গুণ সাবস্ক্রাইব হয়। ফলে সরকার অতিরিক্ত ৪ শতাংশ শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়।
বুধবার খুচরো বিনিয়োগকারীদের অংশ ৬৯ শতাংশ সাবস্ক্রাইব হয়। সব মিলিয়ে অফার ফর সেল ১.২ গুণ সাবস্ক্রাইব হয় এবং সরকার পুরো ৬.৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ৩১,৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে।
SEBI-র শর্তও পূরণ করল LIC
এই শেয়ার বিক্রির ফলে LIC-র পাবলিক শেয়ারহোল্ডিং বেড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে সংস্থাটি সেবি (SEBI)-র ন্যূনতম পাবলিক শেয়ারহোল্ডিং সংক্রান্ত শর্ত ২০২৭ সালের মে মাসের নির্ধারিত সময়সীমার অনেক আগেই পূরণ করল। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২২ সালের মে মাসে LIC-র ঐতিহাসিক আইপিও (IPO)-র পর এই প্রথম সরকার সংস্থাটিতে নিজের অংশীদারিত্ব কমাল।