
'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' এখন ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ (Annapurna Bhandar)। প্রতি মাসে মহিলাদের প্রাপ্য ভাতা বাড়িয়ে এক ধাক্কায় ৩,০০০ টাকা করা হয়েছে। গত ১ জুলাই প্রথম কিস্তির টাকা সরাসরি অনেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এসে গিয়েছে। কিন্তু এই আপাত ডবল টাকার আড়ালেই লুকিয়ে এক অর্থনৈতিক ধাঁধা। ভাতা প্রাপকদের অ্যাকাউন্টে দ্বিগুণ টাকা ঢুকলেও, রাজ্যের সামগ্রিক সমাজকল্যাণমূলক খাতে (Welfare Expenditure) খরচ অনেকটাই কমিয়ে এনেছে নতুন সরকার। এই ম্যাজিক কীভাবে সম্ভব হল? নবান্নের অলিন্দে এখন এটাই সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয়। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের প্রথম বাজেটে এই 'প্যারাডক্স' কীভাবে সম্ভব হল?
উপভোক্তার তালিকায় 'সংশোধন'
তৃণমূল জমানার শেষ লগ্নে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের উপভোক্তার সংখ্যা ছিল প্রায় ২.২ থেকে ২.৪ কোটি। কিন্তু নতুন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের জন্য রাজ্য বাজেটে বরাদ্দ করা হয়েছে ৩৬,০০০ কোটি টাকা। সহজ গাণিতিক হিসেবে, প্রত্যেক মহিলাকে বছরে ৩৬,০০০ টাকা দিতে গেলে এই বরাদ্দে সর্বোচ্চ ১ কোটি বা তার সামান্য কিছু বেশি মহিলাকে ভাতা দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, ভাতার অঙ্ক দ্বিগুণ করলেও উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় অর্ধেক করে দিয়েছে প্রশাসন। ফলে বিপুল টাকা সাশ্রয় হচ্ছে কোষাগারের।
কড়া স্ক্রুটিনি এবং ‘পুরুষ’ ভোটার বাদ
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই জানিয়েছেন, প্রায় ১.৬ কোটি আবেদন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে ২৬ লক্ষেরও বেশি আবেদনপত্র 'ভুয়ো' বা 'শর্ত পূরণ না করায়' সরাসরি বাতিল (Reject) করা হয়েছে। সরকারি স্ক্রুটিনিতে দেখা গিয়েছে, আগের জমানায় প্রায় ১০ লক্ষ পুরুষও কোনওভাবে এই ভাতার সুবিধা নিচ্ছিলেন। তাদের সম্পূর্ণ ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়াও নাগরিকত্ব, ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং আয়কর বা ইডব্লিউএস (EWS) সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করায় বাদ পড়েছেন বহু মানুষ।
কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সঙ্গে সাযুজ্য
আগে রাজ্যের সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির সিংহভাগ খরচ রাজ্য একাই বহন করত। কিন্তু বর্তমান সরকার রাজ্যের ছোট প্রকল্পগুলিকে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের (Centrally Sponsored Schemes) সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে। এর ফলে খরচের একটি বড় অংশ (৬০ থেকে ১০০ শতাংশ) সরাসরি আসছে দিল্লি থেকে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব কোষাগারের ওপর চাপ অনেকটাই কমছে।
বিশাল ঋণের বোঝা
বাজেট পেশের সময় অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, পূর্বতন সরকারের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁরা ৮,১৫,৮৯১ কোটি টাকার এক পর্বতপ্রমাণ ঋণের বোঝা পেয়েছেন। এই অবস্থায় রাজ্যকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে এবং রাজস্ব ঘাটতি (Revenue Deficit) ১.০২ শতাংশে নামিয়ে আনতে 'যত্রতত্র খয়রাতি' বন্ধ করা ছাড়া উপায় ছিল না। আর সেই কারণেই সার্বিক সমাজকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় সংকোচন করে শুধুমাত্র প্রকৃত দুঃস্থদের হাতেই টাকা তুলে দেওয়ার এই 'টার্গেটেড' নীতি নিয়েছে সরকার।