
সময়টা আজ থেকে ঠিক ১১৮ বছর আগের। একটি নিম গাছের নীচ থেকে যাত্রা শুরু হয়েছিল এক স্টক এক্সচেঞ্জের। তবে একটি কেলেঙ্কারি ধ্বংস করে দেয় সেই যাত্রা। কথা হচ্ছে ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ নিয়ে। যা একসময়ে লায়ন্স রেঞ্জে পরিচালিত হত। বাংলায় এর গুরুত্ব ছিল ততটাই, যতটা আজ মুম্বইয়ের দালাল স্ট্রিটের।
কাঠ ব্যবসায়ীরা তুমুল দর হাঁকতেন। শিল্পপতিরা এখান থেকেই পাটকল, চা বাগান এবং জাহাজ কোম্পানিগুলির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতেন। দীর্ঘকাল ধরে এটি ছিল পূর্ব ভারতের আর্থিক হৃদস্পন্দন। কিন্তু আজ সেই বাজার পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ ২০১৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে একটিও লেনদেন করেনি।
এখন স্টক এক্সচেঞ্জ হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার দাবি উঠেছে। সম্প্রতি তাঁর বাজেট বক্তৃতায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী তাঁর ২০২৬-২৭ সালের বাজেট বক্তৃতায় জানিয়েছেন, ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য রাজ্য সরকার পূর্ণ সমর্থন দেবে। এটিকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে যাতে কলকাতা আবারও পূর্ব ভারতের আর্থিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
স্বপন দাশগুপ্ত আরও বলেন, 'ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালু হলে পূর্ব ভারতের সংস্থাগুলির জন্য মূলধন সংগ্রহ সহজতর হবে।' সরকার আরও জানিয়েছে, কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জ পুনরায় চালু হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং রাজ্যের অর্থনীতিতে গতি আসবে।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, এটি কি পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব? উত্তর হল, ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জকে পুনরুজ্জীবিত করার পথ সহজ নয়। এটা বুঝতে হলে আমাদের এর ইতিহাস এবং একসময়ে দেশের আর্থিক হৃদস্পন্দন হিসেবে পরিচিত এই সংস্থাটি কীভাবে ধ্বংসের মুখে পড়ল, তা জানা জরুরি।
সূচনা
কলকাতার স্টক ট্রেডিংয়ের ইতিহাস ১৮৩০-এর দশকে খুঁজে পাওয়া যায়। নিম গাছের নীচে স্টক এক্সচেঞ্জের কার্যক্রম পরিচালিত হত এবং দালালরা সেখানে প্রকাশ্যে লেনদেন করত। ধীরে ধীরে এক্সচেঞ্জ আকারে বড় হতে থাকে এবং এমন এক দিন আসে যখন সমস্ত দালাল সংগঠিত হয়। ফলস্বরূপ ১৯০৮ সালের মে মাসে ১৫০ জন সদস্য নিয়ে 'ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন' নামে একটি সমিতি গঠিত হয়, যার সদর দফতর ছিল, ২ নম্বর চায়না মার্কেট স্ট্রিট।
স্টক এক্সচেঞ্জের পতন
১৯৫৬ সালের ইকুইটি কন্ট্রাক্স অ্যাক্টের অধীনে ১৯৮০ সালের ১৪ এপ্রিল কেন্দ্রীয় সরকার এই এক্সচেঞ্জটিকে স্থায়ী স্বীকৃতি প্রদান করে। কয়েক দশ ধরে এটি ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিল। এটি এশিয়ার প্রাচীনতম স্টক এক্সচেঞ্জ হিসবেও পরিচিত ছিল। এর স্বর্ণযুগে এটি ছিল ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টক এক্সচেঞ্জ। কিন্তু তারপর এটি কেলেঙ্কারির শিকার হয়। সেটি ছিল ২০০১ সালের কেতন পারেখ কেলেঙ্কারি
কেতন পারেখ মামলা
দালাল কেতন পারেখ এতটাই দক্ষতার সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট শেয়ারের দরে কারসাজি করেছিলেন, পুরো ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। পারেখ তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারগুলোর দামে কারসাজি করেছিলেন। যার ফলে এক্সচেঞ্জ জুড়ে হইচই পড়ে যায়। বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
১৯৯৯-২০০১ সালের মধ্যে কেতন IT, মিডিয়া এবং টেলিকম সেক্টর থেকে প্রায় ১০টি স্টক বেছে নেন। যা পরবর্তীতে কে-১০ স্টকস নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি এই স্টকগুলি বিপুল পরিমাণে কিনতেন এবং তারপর বিক্রি করে দিতেন। যার ফলে ট্রেডিংয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যেত। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা স্টকগুলি কিনে নেওয়ার পর কেতন সেগুলি থেকে বেরিয়ে যেতেন। তিনি এই স্টকগুলিতে কৃত্রিম ভাবে লেনদেনের পরিমাণ বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করতেন। এর জন্য ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধারও করেছিলেন। নিয়ম লঙ্ঘন করেছিলেন।
পুরো খেলা চলত পর্দার আড়ালে। ২০০১ সালের বাজেটের সময়ে বাজার দ্রুত পড়তে শুরু করল। ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জের তীব্র পতন হল। কেতন পারেখের শেয়ারের দামও কমে যেতে থাকল। ব্যাঙ্কগুলি বন্ধক রাখা শেয়ারের বিনিময়ে আসল নগদ টাকা ফেরত চাইতে শুরু করল। এরপর দালালরা শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করল এবং ব্যাপক বিক্রির হিড়িক পড়ে গেল।
মুখ থুবড়ে পড়ল এক্সচেঞ্জ
এটি এতটাই বড় কেলেঙ্কারি ছিল, ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ আর কখনওই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ২০০৫ থেকে ২০১২-র মধ্যে লেনদেন ৯০% কমে যায়।
পুনরায় চালু করা কতটা কঠিন?
পুনরায় চালু করার পথ সহজ নয়। ২৫৩ কোটি টাকায় এর সম্পদ বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সৃজন গ্রুপের কাছে। মামলা কলকাতার আদালতে বিচারাধীন। সেক্ষেত্রে পুনরায় চালু করতে সেবির অনুমোদন প্রয়োজন হবে। আধুনিক ট্রেডিং ও ক্লিয়ারিং পরিকাঠামো লাগবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস ফেরানো।