
EMI দিতে কিছু দিতে দেরি হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এল। তারপরেই আপনার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের কাছে ফোন, অফিসের সহকর্মীদের কাছে ফোন, একেবারে ফোনে ফোনে জেরবার! সবাইকে জানানো হচ্ছে, আপনি EMI দেননি। এমনকী প্রতিবেশীদেরও জানানো হচ্ছে, আপনি ডিফল্টার বা ঋণখেলাপি।
বছরের পর বছর ধরে বহু মানুষ এই অত্যাচারের শিকার। সম্মানহানি। এমনকী অনেকে আত্মঘাতীও হয়েছেন। এবার লোন রিকভারির ক্ষেত্রে কড়া অ্যাকশন নিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা RBI। সব ব্যাঙ্ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও রিকভারি এজেন্টদের কড়া নির্দেশ দিল আরবিআই। ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে কবে এবং কীভাবে ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে, রিকভারি এজেন্টরা কী বলতে পারবেন, তাঁদের উপর ব্যাঙ্ক কীভাবে নজরদারি চালাবে এবং নিয়ম ভাঙলে ঋণগ্রহীতারা কী ধরনের ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন, এই সব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
আরবিআই-এর এই নির্দেশিকা কার্যকর হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত খসড়া নির্দেশিকার উপর বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মতামত ও পরামর্শ খতিয়ে দেখার পরই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) চূড়ান্ত সংশোধিত নির্দেশিকা জারি করেছে। এর উদ্দেশ্য হল, বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঋণের বকেয়া আদায় এবং রিকভারি এজেন্সি নিয়োগের জন্য একটি অভিন্ন ও স্বচ্ছ নীতিমালা চালু করা। তবে ঋণগ্রহীতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল, RBI স্পষ্ট করে দিয়েছে, ঋণ আদায়ের নামে কোনওভাবেই ঋণগ্রহীতার মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ন্যায্য আচরণের অধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না।
কেন RBI এই পদক্ষেপ করল?
ঋণগ্রহীতার থেকে টাকা আদায়ের জন্য রিকভারি এজেন্টদের দুর্ব্যবহার বহু পুরনো সমস্যা। কিছু ক্ষেত্রে অপমানের সব সীমা লঙ্ঘন করে দেয় রিকভারি এজেন্টরা। ফোন কল থেকে শুরু করে বাড়িতে যাওয়া, আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করা, সহকর্মীদের জানানোর মতো ঘটনা ঘটে। এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রকাশ্যে সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতাকে হেনস্থা করা হয়। এই নানা ইস্যুতেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আরবিআই। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাঙ্ককে ঋণের বকেয়া আদায়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি (পলিসি) তৈরি করতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের পরিচালন পর্ষদের (বোর্ড) অনুমোদিত হবে। ব্যাঙ্কের নিজস্ব কর্মী বা বাইরে থেকে নিয়োগ করা রিকভারি এজেন্সি—যেই ঋণ আদায়ের কাজ করুক না কেন, এই নীতিমালা সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
আরবিআই প্রত্যেক ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছে, একটি ফ্রেমওয়ার্ক জমা দেওয়ার জন্য। এই নীতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে, কীভাবে ধাপে ধাপে সেই প্রক্রিয়া এগোবে, রিকভারি এজেন্টদের জন্য কী ধরনের আচরণবিধি মানা বাধ্যতামূলক, আর্থিক সঙ্কটে থাকা ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, ঋণগ্রহীতার মৃত্যু হলে বকেয়া আদায়ের প্রক্রিয়া কী হবে এবং আইনি বা কঠোর আদায়ের পর্যায়ে যাওয়ার আগে ঋণ নিষ্পত্তির কী কী বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে।
সব ব্যাঙ্ককে আরবিআই নির্দেশ দিয়েছে, নতুন নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে ঋণ আদায়ের কারণে কোনও ঋণগ্রহীতা বা গ্যারেন্টর আর্থিক বা অন্য কোনও ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হলে, তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান ব্যাঙ্কগুলিকে নিজেদের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
রিকভারি এজেন্টরা কী কী করতে পারবে না?
RBI-এর নয়া নির্দেশিকায় বলা হচ্ছে, রিকভারি এজেন্ট ও ব্যাঙ্ক কর্মীরা কোনও রকম নির্মম প্রক্রিয়ায় টাকা আদায় করতে পারবেন না। কী কী ধরনের নির্মম প্রক্রিয়ার তালিকায় রেখেছে আরবিআই?
১. রিকভারি এজেন্টরা হুমকি, ব্যক্তিগত হেনস্থা ও গালিগালাজ করতে পারবে না।
২. ভিডিও পোস্ট করা, অডিও রেকর্ডিং পোস্ট করা বা ঋণগ্রহীতার ব্যক্তিগত তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াতে পারবে না।
৩. সোশ্যাল মিডিয়া বা মোবাইল ফোনে আপত্তিকর মেসেজ করতে পারবে না।
৪. কোনও ঋণগ্রহীতাকে জনসমক্ষে হেনস্থা করতে পারবে না রিকভারি এজেন্টরা।
৫. ঋণগ্রহীতার পরিবারের সম্মানহানি হবে, এমন কোনও কাজ করতে পারবে না।
৬. ঋণগ্রহীতার সম্পর্কে কোনও মিথ্যে অপবাদ প্রচার করা যাবে না।
এই নির্দেশিকা যদি লঙ্ঘন হয়, তাহলে কড়া আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।
রিকভারি এজেন্টরা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই যোগাযোগ করতে পারবেন
আরবিআই-এর নয়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শুধুমাত্র সকাল ৮টা থেকে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন ব্যাঙ্ককর্মী ও রিকভারি এজেন্টরা। এই সময়সীমার বাইরে যদি কোনও রিকভারি এজেন্ট যোগাযোগ করে বা বাড়িতে যেতে চায়, তবে তা ঋণগ্রহীতার অনুমতি নিয়ে তা করতে হবে। কোনও নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখ করে যদি ঋণগ্রহীতা জানান, তাঁকে বিরক্ত করা যাবে না, তা হলে সেই অনুরোধ মানতে হবে রিকভারি এজেন্টদের। RBI স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, পরিবারের কারও মৃত্যুজনিত শোকের সময়, চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতি, বিয়ে সহ পারিবারিক অনুষ্ঠান অথবা অন্য কোনও অনুরূপ দুর্যোগপূর্ণ বা সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতিতে রিকভারি এজেন্টরা ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না।
রিকভারি এজেন্টের সঙ্গে কোথায় দেখা করবেন, তা ঠিক করতে পারবেন ঋণগ্রহীতারা
আরবিআই নয়া নির্দেশিকায় জানিয়েছে, রিকভারি এজেন্ট যদি দেখা করতে চায়, তবে ঋণগ্রহীতা যে স্থানে দেখা করতে চাইবেন, সেখানেই দেখা করতে হবে। ঋণগ্রহীতা যদি আগে থেকেই যোগাযোগের জন্য কোনও নির্দিষ্ট স্থান বা পদ্ধতির কথা জানিয়ে থাকেন, তবে রিকভারি এজেন্টকে সেটিই অনুসরণ করতে হবে। তবে ঋণগ্রহীতা যদি এমন কোনও পছন্দের কথা না জানান, অথবা নির্ধারিত স্থানেও পরপর অন্তত দু'বার উপস্থিত না হন, সেক্ষেত্রেই কেবল রিকভারি এজেন্ট তাঁর বাড়ি বা কর্মস্থলে গিয়ে যোগাযোগ করতে পারবেন।
আরবিআই ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে, ঋণগ্রহীতার সঙ্গে তাগাদার জন্য প্রথমবার দেখা করতে চাইলে,তাঁকে অন্তত একদিন আগে জানাতে হবে। একই সঙ্গে যে রিকভারি এজেন্ট যাবে,তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও জানাতে হবে। যদি কোনও ব্যাঙ্ক রিকভারি এজেন্সি বদল করে, তাহলেও তা তত্ক্ষণাত্ ঋণগ্রহীতাকে জানাতে হবে। RBI ব্যাঙ্কগুলিকে নির্দেশ দিয়েছে, তাদের ওয়েবসাইটে অনুমোদিত সমস্ত রিকভারি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করতে হবে। ওই তালিকায় প্রতিটি রিকভারি এজেন্সির নাম, ঠিকানা, কোন উদ্দেশ্যে তাদের নিয়োগ করা হয়েছে এবং কতদিনের জন্য তাদের নিয়োগ করা হয়েছে, এই সমস্ত তথ্য উল্লেখ করতে হবে।
রিকভারি এজেন্টদের নিয়ে দায় এড়াতে পারবে না ব্যাঙ্ক
আরবিআই তাদের নয়া নীতিতে জানিয়েছে, রিকভারি এজেন্টদের ব্যবহারের দায় ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরও থাকবে। যদি কোনও রিকভারি এজেন্ট আরবিআই নীতির বাইরে গিয়ে দুর্ব্যবহার করে, তার দায় ব্যাঙ্ক বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান এড়াতে পারবে না। RBI আরও নির্দেশ দিয়েছে, রিকভারি এজেন্সিগুলি শুধুমাত্র সেইসব রিকভারি এজেন্টকেই নিয়োগ করতে পারবে, যাঁরা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ব্যাঙ্কিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স (IIBF) পরিচালিত 'ডেট রিকভারি এজেন্ট' প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া, IIBF-এর সঙ্গে টাই-আপ থাকা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের সমমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও এই কাজে নিয়োগের যোগ্য হবেন।
প্রতিটি ফোন কল রেকর্ড করা মাস্ট
RBI জানিয়ে দিয়েছে, ঋণগ্রহীতাকে ব্যাঙ্ককর্মী বা রিকভারি এজেন্ট ফোন করলে, সেই ফোন কলের রেকর্ডিং রাখা আবশ্যিক। ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতার যে নম্বর দেবে, সেই নম্বরেই শুধুমাত্র ফোন করতে পারবে রিকভারি এজেন্টরা। RBI নির্দেশ দিয়েছে, ঋণ আদায় সংক্রান্ত ফোনালাপের রেকর্ডিং কলের তারিখ থেকে অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। তবে কোনও মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকলে, সেই আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত রেকর্ডিং সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি ফোনালাপ শুরুর আগে ঋণগ্রহীতাকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে ওই কথোপকথন রেকর্ড করা হচ্ছে।
কোনও রকম অ্যাগ্রেসিভ বা অতিতত্পরতা দেখাতে পারবে না রিকভারি এজেন্টরা
কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক নির্দেশ দিয়েছে, ব্যাঙ্কগুলিকে নিশ্চিত করতে হবে যে কর্মী বা রিকভারি এজেন্সির জন্য নির্ধারিত ঋণ আদায়ের লক্ষ্য (রিকভারি টার্গেট) কিংবা ইনসেনটিভ ব্যবস্থা যেন কোনওভাবেই কঠোর, ভয়ভীতি প্রদর্শনমূলক বা হয়রানিমূলক ঋণ আদায়ের পদ্ধতিকে উৎসাহিত না করে। অর্থাৎ, এখন ব্যাঙ্কগুলিকে শুধু রিকভারি এজেন্টদের আচরণই নয়, তাঁদের কীভাবে ইনসেনটিভ দেওয়া হচ্ছে, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। যাতে দ্রুত ঋণ আদায়ের চাপ বা অতিরিক্ত ইনসেনটিভের লোভে কোনও এজেন্ট ঋণগ্রহীতাকে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া বা হয়রানির মতো অনৈতিক পন্থা অবলম্বন না করে।
রিকভারি এজেন্টকে নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ ভাবে জানাতে হবে ঋণগ্রহীতাকে। একইসঙ্গে বকেয়া ঋণ আদায়ের সময় ব্যাঙ্কের অথরাইজেশন লেটার বা রিকভারি এজেন্সির লেটার সঙ্গে রাখতে হবে এজেন্টকে। যাতে ঋণগ্রহীতা সংশ্লিষ্ট এজেন্ট সম্পর্কে সব তথ্য পান।
ঋণগ্রহীতারা ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন
আরবিআই নয়া নির্দেশে জানিয়েছে, ব্যাঙ্ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা রিকভারি এজেন্সি যদি আরবিআই-এর নয়া নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে, সে ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা পাল্টা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন।
মোদ্দা বিষয়, আরবিআই-এর স্পষ্ট বার্তা, ব্যাঙ্ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠাগুলি ঋণ আদায় করতে পারবে, কিন্তু ঋণগ্রহীতার মানহানি, হেনস্থা করে নয়। বরং গোপনীয়তা বজায় রেখে। সম্মানের সঙ্গে।