
পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৬০ টাকা! শুধু পেঁয়াজ নয়, চিনি এবং সর্ষের তেলের দামও বেড়েছে। মোদ্দা কথা, বেড়ে গিয়েছে বাড়ির খাওয়া খরচ। শুধু বাংলার ছবিটাই এমন নয়। গোটা দেশেই বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। আর এ থেকে মানুষকে স্বস্তি দিতে সরকার কী করল? সরকার চালিয়ে দিল পেঁয়াজের ট্রেন। নাম 'কান্দা এক্সপ্রেস' (Kanda Express)। নাসিক থেকে পেঁয়াজ নিয়ে দিল্লি, চেন্নাই, মাদুরাই, কোচি এবং গুয়াহাটিতে পৌঁছবে এই ট্রেন। প্রশ্ন হল, পেঁয়াজ এত দামি হচ্ছে কেন? সরকারই যখন বলছে দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি নেই, তা হলে কেজি প্রতি ৫০-৬০ টাকা দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেন? আর নাসিক থেকে ট্রেনে পেঁয়াজ পাঠালেই কি ফের নিয়ন্ত্রণে আসবে দাম?
গত ২৪ অগাস্ট দেশে পেঁয়াজের গড় খুচরো দাম কেজিতে ৪৩.৫৩ টাকায় পৌঁছেছিল। এক বছর আগে একই দিনে এই দাম ছিল ২৭.৩৭ টাকা। ফলে এক বছরে গড় খুচরো দাম প্রায় ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। শুধু খুচরো বাজারেই নয়, পাইকারি বাজারেও পেঁয়াজের দাম আগুন। গড় পাইকারি দাম কেজি প্রতি ৩৫.৫৮ টাকা। যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ২১.২৩ টাকা। পাইকারি দামে বৃদ্ধি প্রায় ৬৮ শতাংশ।
আর কয়েকটি বড় শহরে তো জাতীয় গড়ের তুলনায় পেঁয়াজের দাম অনেকটাই বেশি। ২৪ অগাস্ট চেন্নাইয়ে পেঁয়াজের দাম ছিল কেজি প্রতি প্রায় ৬০ টাকা, দিল্লিতে ৫৫ টাকা এবং কলকাতায় প্রায় ৬০ টাকা। এক দিকে দেশের গড় দাম ৪৩-৪৪ টাকা, অন্যদিকে কয়েকটি শহরে সেটাই বিকোচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।
পেঁয়াজের দাম এত বাড়ছে কেন?
ভারতে বছরে বিভিন্ন সময়ে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। নানা সময়ে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাজারে পেঁয়াজের জোগান আসে। আর সেই কারণেই আবহাওয়া এবং জোগানের প্রভাব পেঁয়াজের দামে খুব দ্রুত পড়ে। এই মুহূর্তে দামবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল, পেঁয়াজের জোগান কমে যাওয়া। নাসিকের লাসালগাঁও দেশের অন্যতম বড় পেঁয়াজের পাইকারি বাজার। সেখানে পেঁয়াজের জোগান কমলে সরাসরি প্রভাব পড়ে পাইকারি দামে। ১৮ অগাস্ট পর্যন্ত লাসালগাঁও বাজারে পেঁয়াজের গড় পাইকারি দাম প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি ছিল। ২৫ অগাস্ট সেখানে দাম কুইন্টাল প্রতি ৪,২৫০ টাকারও বেশি উঠে গিয়েছে।
পেঁয়াজ উৎপাদনে ঘাটতি নেই
সরকার বলছে, দেশে পেঁয়াজের ঘাটতি নেই। ২০২৫-২৬ সালে দেশে প্রায় ৩০৭ লক্ষ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হতে পারে। গত বছর উৎপাদন ছিল প্রায় ৩০৮ লক্ষ টন। মোট উৎপাদনের পরিমাণে খুব বড় কোনও পতন দেখা যাচ্ছে না।
তাহলে পেঁয়াজ কেন দামি?
দেশে মোট পেঁয়াজের পরিমাণ পর্যাপ্ত। কিন্তু বাজারে যতটা পেঁয়াজ দরকার, সেই জোগান পৌঁছচ্ছে না। সরকারের বক্তব্য, এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই এখন বাফার স্টক ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারের কাছে পেঁয়াজের একটি বাফার স্টক থাকে। সহজ ভাষায়, আপৎকালীন মজুত। বাজারে পেঁয়াজের জোগান কমে গেলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সেই মজুত বাজারে ছাড়ে সরকার। এবারও সেটাই হচ্ছে। ট্রাকে পেঁয়াজ পাঠানোর বদলে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ পাঠানো হচ্ছে রেল মারফত।
এবার ‘কান্দা এক্সপ্রেস’
'কান্দা'র বাংলা তর্জমা পেঁয়াজ। নাসিকের লাসালগাঁও থেকে পেঁয়াজ নিয়ে সেই সব বড় বাজার বা শহরে পাঠানো হবে, যেখানে দাম তুলনামূলক বেশি। প্রথম এক্সপ্রেসের গন্তব্য দিল্লি। ৮৪০ টন পেঁয়াজ। এরপর চেন্নাই, মাদুরাই, কোচি এবং গুয়াহাটিতেও পেঁয়াজ পাঠানো হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে আরও গন্তব্য যুক্ত হতে পারে। হিসাবটা সহজ, যেখানে পেঁয়াজ রয়েছে, সেখান থেকে তুলে নিয়ে যেখানে দাম বেশি, সেখানে পৌঁছে দাও। সরবরাহ বাড়লে পাইকারি দাম কমবে। আর পাইকারি দাম কমলে তার প্রভাব পড়বে খুচরো বাজারেও।
৩৫ টাকা কেজি পেঁয়াজ
সরকার শুধু পেঁয়াজ পাঠাচ্ছে না, কিছু জায়গায় তা তুলনামূলক কম দামেও বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোক্তা বিষয়ক সচিবের বক্তব্য, বাফার স্টকের পেঁয়াজ পাইকারি এবং খুচরো বাজারে ছাড়া হবে। খুচরো বাজারে সরকারি সংস্থা এনসিসিএফ (NCCF) এবং এনএএফইডি--এর (NAFED) মাধ্যমে কেজি প্রতি প্রায় ৩৫ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। বাজারে যেখানে পেঁয়াজ ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, সেখানে সরকার ৩৫ টাকা দরে পেঁয়াজ দিলে অন্তত ওই এলাকার ক্রেতারা সস্তায় পেঁয়াজ পাবেন।
গোটা দেশে ৩৫ টাকা কেজি?
গোটা দেশে পেঁয়াজের দাম ৩৫ টাকা কেজি হয়ে যাবে না। কারণ সরকার বাফার স্টক থেকে যতটা পেঁয়াজ বের করতে পারে, তারও একটা সীমা রয়েছে। মূলত যে সব শহর এবং বাজারে দাম বেশি, সেখানেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া সরকারি মজুত একসঙ্গে পুরোটা বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয় না। প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে তা বাজারে আনা হয়।
দাম বাড়ার পিছনে মজুতদারি?
দেশে যদি পেঁয়াজের জোগান ঠিকঠাক থাকে, তাহলে দ্রুত দাম বাড়ল কীভাবে? ভোক্তা বিষয়ক সচিব নিধি খারে জানিয়েছেন, নাসিকের বাজারে পেঁয়াজের দাম দিল্লির তুলনায় বেশি। সাধারণত এমনটা হওয়ার কথা নয়। কারণ নাসিক দেশের অন্যতম বড় উৎপাদন কেন্দ্র। ফলে মজুতদারির আশঙ্কা ওড়ানো যাচ্ছে না। তাই পেঁয়াজের ঘাটতিই দাম বাড়ার কারণ কিনা, সে নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
পেঁয়াজের দাম কমবে?
পেঁয়াজের দাম কমা শুধু কান্দা এক্সপ্রেসের উপর নির্ভর করছে না। পেঁয়াজের বাজার জোগানের উপর নির্ভরশীল। বাজারে জোগান বাড়লে কমবে পাইকারি দাম। তখনই খুচরো বাজারে সস্তা হবে পেঁয়াজ। সরকারের দাবি, আগামী কয়েক মাসের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পেঁয়াজ দেশে রয়েছে। ঘাটতির পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই বাজারে জোগান বাড়িয়ে দেওয়াই উদ্দেশ্য।