
প্রায় চার বছর পর দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি। শুক্রবার লিটারপিছু প্রায় ৩ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে জ্বালানির দাম। এর জেরে শুধু গাড়ির তেল ভরানোর খরচই নয়, আগামী দিনে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়লে চাপ আরও বাড়তে পারে সাধারণ মানুষের উপর।
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর দিল্লিতে পেট্রোলের দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ৯৭.৭৭ টাকা প্রতি লিটার। ডিজেলের দাম পৌঁছেছে প্রায় ৯০.৬৭ টাকা প্রতি লিটারে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি দীর্ঘ দিন দাম অপরিবর্তিত রাখার পর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি দেশবাসীকে জ্বালানি খরচ কমানোর আবেদন করেছিলেন। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতের আমদানি ব্যয়ের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। সেই আবহেই এই মূল্যবৃদ্ধি ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধি আপাতত শুরু মাত্র। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আরও জটিল হলে আগামী দিনে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম আরও বাড়তে পারে। ফাউন্ডেশন ফর ইকনমিক ডেভেলপমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা-ডিরেক্টর রাহুল আহলুওয়ালিয়ার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের জোগান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই জ্বালানির দাম বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছিল।
সবচেয়ে দ্রুত প্রভাব পড়বে যাতায়াত খরচে। যাঁরা প্রতিদিন বাইক বা গাড়ি ব্যবহার করেন, তাঁদের খরচ বাড়বে সরাসরি। একই সঙ্গে ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস পরিষেবা, ট্রাক পরিবহণ এবং পণ্য সরবরাহের খরচও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে অটোভাড়া, ট্যাক্সি ভাড়া এবং মালবাহী পরিবহণে।
তবে প্রভাব শুধু রাস্তাতেই আটকে থাকবে না। দেশের অধিকাংশ খাদ্যপণ্য ট্রাকের মাধ্যমে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পৌঁছয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে সবজি, ফল, দুধ, চাল, ডাল, প্যাকেটজাত খাবারের পরিবহণ খরচও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত চাপ পড়বে সাধারণ ক্রেতার পকেটেই।
ইতিমধ্যেই দুধের দামে তার ইঙ্গিত মিলেছে। সম্প্রতি আমূল এবং মাদার ডেয়ারি লিটারপিছু ২ টাকা করে দুধের দাম বাড়িয়েছে। সংস্থাগুলির দাবি, জ্বালানি ও পরিবহণ খরচ বৃদ্ধির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন ডেলিভারি পরিষেবাও আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। খাবার সরবরাহকারী অ্যাপ, ই-কমার্স সংস্থা, কুরিয়ার পরিষেবা কিংবা গ্রোসারি ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম; সব ক্ষেত্রেই লজিস্টিক খরচ বাড়বে। সেই ক্ষতি সামলাতে সংস্থাগুলি ডেলিভারি চার্জ বাড়াতে পারে অথবা ডিসকাউন্ট কমাতে পারে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে গোটা সংসারের মাসিক বাজেটেও। কারণ পরিবহণ খরচ বাড়লে তার প্রভাব প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ বেড়ে গেলে অনেক পরিবারই অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমাতে বাধ্য হয়। বেড়াতে যাওয়া বা বড় কেনাকাটার পরিকল্পনাও পিছিয়ে যেতে পারে।
গ্রামের অর্থনীতিতেও বড় চাপ তৈরি হতে পারে। কৃষিকাজে এখনও ডিজেল চালিত ট্র্যাক্টর, সেচ পাম্প এবং পণ্য পরিবহণের উপরই ভরসা করেন বহু কৃষক। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে চাষের খরচও বাড়বে। তার প্রভাব ভবিষ্যতে খাদ্যদ্রব্যের দামেও পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতে জ্বালানির দাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ পরিবহণ ব্যয় দেশের উৎপাদন, কৃষি, খুচরো ব্যবসা থেকে পরিষেবা; প্রায় সব ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়তে পারে। আর সাধারণ মানুষের কাছে তার অর্থ একটাই; ধীরে ধীরে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে দৈনন্দিন জীবন।