
ইএমআই-তে কেনা ফোন কি ঋণ শোধ না করলে লক করে দেওয়া যাবে? লক হলেও কখন বা কীভাবে লক হবে? আর সমস্ত ইএমআই মিটিয়ে দেওয়ার পরই বা কীভাবে সেটা আনলক করা সম্ভব? গত কয়েক মাস ধরেই নানা জল্পনায় ছড়াচ্ছিল বিভ্রান্তি। অবশেষে এ নিয়ে সমস্ত ধোঁয়াশা দূর করল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (RBI)। সহজ ভাষায় পুরোটা বুঝে নিন।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, পার্সোনাল লোন, গাড়ি বা হোম লোনের কিস্তি খেলাপ (Default) করলে কোনও গ্রাহকের মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ বন্ধ করতে পারবে না ব্যাঙ্কগুলি। বিশেষ ক্ষেত্রে ঋণ উদ্ধারের জন্য ডিভাইস বন্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে! শুরুতেই হঠাৎ করে লক করে দেওয়া যাবে না। ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এগোতে হবে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর হতে চলেছে। ইএমআই শোধ করার কত ক্ষণের মধ্যে ফোন আনলক করতে হবে এবং তা না করলে ব্যাঙ্কের তরফে কী জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ মিলবে, সবটাই ঠিক করে দিল আরবিআই।
কোন ক্ষেত্রে ফোন লক
কোনও গ্রাহক নির্দিষ্ট সেই মোবাইল ফোনটি কেনার জন্যই লোন নিয়ে থাকলে ডিভাইসে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে ব্যাঙ্ক। অর্থাৎ হোম লোন বা পার্সোনাল লোনের বকেয়ার জন্য ফোন লক করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
ধাপে ধাপে লকিং প্রক্রিয়া
ইএমআই না দেওয়ার ৩০ দিন পার হলে তবেই ডিভাইস ব্লকিংয়ের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। পুরো ডিভাইসটি বন্ধ বা ব্লক করার অনুমতি দেওয়া হবে কিস্তি মেটানোর মেয়াদ ৬০ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর।
দরকারি পরিষেবা সচল
ফোন লক করা হলেও জরুরি পরিষেবা বন্ধ করা যাবে না। ইনকামিং কল, এসএমএস,এসওএস ফিচার এবং কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রয়োজনীয় অ্যাপ বা সুবিধাগুলি সচল রাখতে হবে।
বিলম্বে ক্ষতিপূরণ
লোন পরিশোধ করার ১ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাঙ্ককে ডিভাইসের লক সরিয়ে দিতে হবে। দেরি হলে গ্রাহককে ঘণ্টা প্রতি ২৫০ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ব্যাঙ্ককে। তবে এই ক্ষতিপূরণের মোট অঙ্ক মূল লোনের পরিমাণের চেয়ে বেশি হতে পারবে না।
ব্যক্তিগত তথ্য দেখা নয়
গ্রাহকের কল লগ, মেসেজ বা গ্যালারির ছবি দেখতে পারবে না ব্যাঙ্ক বা কোনও সংস্থা।
রিকভারি এজেন্টদের উপরে রাশ
চলতি বছরের মে মাসে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যে প্রস্তাবিত খসড়া এনেছিল, এটি তারই চূড়ান্ত রূপ। লোন খেলাপকারীদের ফোন পুরোপুরি ব্লক করে দেওয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হেনস্থা করার একাধিক অভিযোগ জমা পড়ছিল আরবিআই-এর কাছে। তার পরই এই নতুন নীতি তৈরি করা হয়। লোন রিকভারি এজেন্টদের দাদাগিরি বন্ধ করতে একাধিক কঠোর নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।
আগে থেকে জানাতে হবে
ব্যাঙ্ক বা এজেন্সির রিকভারি এজেন্টরা হঠাৎ করে গ্রাহকের বাড়িতে হাজির হতে পারবেন না। অন্তত এক দিন আগে গ্রাহককে জানাতে হবে।
নির্দিষ্ট সময়
রিকভারি এজেন্টরা সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ বা দেখা করতে পারবেন। গ্রাহক নিজে অন্য কোনও সময়ে দেখা করার অনুমতি দিলে তবেই ব্যতিক্রম সম্ভব।
এজেন্সি বদল
ব্যাঙ্ক যদি রিকভারি এজেন্সির পরিষেবা বাতিল করে বা নতুন সংস্থা নিয়োগ করে, তা গ্রাহকে জানাতে হবে। এছাড়া নিজস্ব ওয়েবসাইটে অনুমোদিত রিকভারি এজেন্সিগুলির তালিকা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।
হেনস্থা নয়
সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা, আত্মীয়-স্বজন বা সহকর্মীদের হুমকি দেওয়া বা ভয় দেখানো যাবে না। গালিগালাজ, ঘন ঘন ফোন করা, পরিচয় গোপন রেখে কল করা বা প্রকাশ্যে অপমান করার মতো অপরাধ করলে চরম আইনি পদক্ষেপ করা হবে।
ব্যাঙ্কের নিজস্ব নীতি
নতুন এই নিয়মের অধীনে প্রতিটি ব্যাঙ্ককে ঋণ উদ্ধারের জন্য বিস্তারিত একটি নীতি তৈরি করতে হবে। কোন পরিস্থিতিতে রিকভারি শুরু হবে, আর্থিক সমস্যায় থাকা গ্রাহকদের সঙ্গে কীভাবে সংবেদনশীল আচরণ করা হবে, রিকভারি এজেন্সি কীভাবে নিয়োগ হবে এবং নজরদারি কীভাবে চালানো হবে, সবটাই নথিবদ্ধ রাখতে হবে।
দেশের সমস্ত কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের ওপর এই নিয়ম কার্যকর হবে। তবে স্মল ফাইন্যান্স ব্যাঙ্ক, পেমেন্ট ব্যাঙ্ক, আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাঙ্ক (RRB) এবং লোকাল এরিয়া ব্যাঙ্কগুলিকে আপাতত এই নির্দেশের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
পাঠকদের বলে দিই, ইএমআই সময়মতো শোধ করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ফোন লক বা রিকভারি এজেন্টের বিড়ম্বনায় না পড়াই ভাল।