
নিকট ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কার্যত খারিজ করল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। বরং আগামী দিনে পরিস্থিতি অনুযায়ী সুদের হার বাড়ানো অথবা বর্তমান হার অপরিবর্তিত রাখার পথেই হাঁটতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। অক্টোবরের মুদ্রানীতি কমিটির (MPC) বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এমনই ইঙ্গিত দিয়েছে RBI। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভারতীয় অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।
অক্টোবরের MPC বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫.৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের পর প্রকাশিত কার্যবিবরণীতে RBI স্পষ্ট করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আগামী দিনে সুদের হার বাড়ানো হবে, নাকি বর্তমান হারেই স্থির থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, তা নির্ভর করবে মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতির উপর। RBI-এর পরবর্তী মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা ২ থেকে ৪ ডিসেম্বর।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ RBI-এর
RBI-এর মতে, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি ততটা স্বস্তিদায়ক নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন ত্রৈমাসিকে খুচরো মূল্যবৃদ্ধির হার গড়ে প্রায় ৫.৮ শতাংশ থাকতে পারে। চলতি বছরে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির উপাদান বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যবৃদ্ধি বা কোর ইনফ্লেশন ৪.৪ শতাংশ হতে পারে বলেও অনুমান করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মুদ্রানীতির সুদের হার পুনর্বিবেচনা করা জরুরি ছিল বলে জানিয়েছে RBI। মূল্যবৃদ্ধির চাপ শুধু সরবরাহের সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা উৎপাদন খরচ, সংস্থাগুলির পণ্যের দাম নির্ধারণ এবং চাহিদার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের।
কেন সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কম?
RBI-এর বক্তব্য, আগামী দিনে সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত গতিপ্রকৃতি, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিস্থিতি এবং সরবরাহের ধাক্কার প্রভাব খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে, মূল্যবৃদ্ধির চাপ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কতটা ছড়িয়ে পড়ছে এবং তার ফলে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব কতটা তৈরি হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
সরবরাহের সমস্যার কারণে পণ্য বা জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পরে কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা এবং সংস্থাগুলির পণ্যের দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্তেও পড়তে পারে। এই ধরনের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করাই মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছে RBI।
এ প্রসঙ্গে RBI গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা বলেন, সরবরাহজনিত মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মুদ্রানীতি মূলত তার দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা এবং সংস্থাগুলির পণ্যের দাম নির্ধারণের আচরণ সেই প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর বক্তব্য, সরবরাহজনিত চাপের ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পরোক্ষ প্রভাব এবং মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রভাবকে আলাদা করে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ, দুটিরই প্রতিফলন কোর ইনফ্লেশনে দেখা যেতে পারে।
চাহিদা বাড়লেও বাড়তে পারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ
মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে চাহিদার দিকটিও নজরে রাখছে RBI। গভর্নরের মতে, অর্থনীতিতে অর্থের জোগান এবং ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে চাহিদার দিক থেকে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তাই শুধু সাময়িকভাবে পণ্যের দাম বেড়েছে কি না, তা দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। মূল্যবৃদ্ধির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে কি না এবং তা অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা হবে।
সব মিলিয়ে, আগামী দিনে RBI-এর মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে আপাতত সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। ডিসেম্বরের MPC বৈঠকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।