
অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠানের জেলা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা। শুধু প্রতিষ্ঠান সংখ্যায় নয়, এই ধরনের সংস্থায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যাতেও দেশের মধ্যে শীর্ষে এই জেলা। উত্তর ২৪ পরগনায় এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬.৫৯ লক্ষ এবং সেখানে কাজ করেন ২১.৩ লক্ষ মানুষ। পিছিয়ে নেই দক্ষিণ ২৪ পরগনাও। সেখানে অসংগঠিত অ-কৃষি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০.২৯ লক্ষ। কর্মরত মানুষের সংখ্যা ১২.৪ লক্ষ। তবে প্রতিষ্ঠান বেশি হলেও এই দুই জেলায় প্রতি প্রতিষ্ঠানের মোট মূল্য সংযোজন বা GVA তুলনামূলকভাবে কম। উত্তর ২৪ পরগনায় ১.৫৯ লক্ষ টাকা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ১.৬২ লক্ষ টাকা।
কেন এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ? কারণ অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রের মধ্যে এমন বহু ছোট ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলি কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত নয়। এই ক্ষেত্রের মধ্যে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ফলে কোনও জেলায় এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি থাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের বড় উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। তবে প্রতিষ্ঠান সংখ্যা বেশি হলেই যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক উৎপাদন বা মূল্য সংযোজনও বেশি হবে, এমন নয়। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার তথ্যেও সেই পার্থক্য স্পষ্ট।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অসংগঠিত অ-কৃষি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দেশের মধ্যে অন্যতম বেশি। কিন্তু প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ, বাংলায় ছোট ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের বিস্তার বড় হলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠান গড়ে অর্থনীতিতে যে নতুন মূল্য যোগ করছে, তা গুজরাতের সুরতের মতো জেলার তুলনায় অনেক কম। অর্থনীতির ভাষায়, এটি ছোট প্রতিষ্ঠানের কম উৎপাদনশীলতা বা কম মূল্য সংযোজনের ইঙ্গিত হতে পারে।
এই তথ্য উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রক বা MoSPI-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট ‘Unincorporated Sector at the District Level: Insights from ASUSE 2025’-এ। অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রের জেলাভিত্তিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই রিপোর্টে। সমীক্ষার সময়কাল ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর।
রিপোর্ট অনুযায়ী, অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশের বিভিন্ন জেলার মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। নির্দিষ্ট কিছু জেলায় এই কর্মকাণ্ডের ঘনত্ব অনেক বেশি। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অসংগঠিত প্রতিষ্ঠান থাকা ১০টি জেলা চারটি রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছে, গুজরাট, তেলঙ্গানা, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ। আর সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে শীর্ষ ৫০টি জেলা রয়েছে ১২টি রাজ্যে। এই তালিকায় রয়েছে বিহার, গুজরাত, কর্নাটক, কেরল, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা, পঞ্জাব, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, তেলঙ্গানা, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ।
রিপোর্টে আরও দেখা গিয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার নিরিখে শীর্ষ ১০টি জেলা একসঙ্গে দেশের এই ক্ষেত্রের মোট প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-দশমাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। একইভাবে, এই ১০টি জেলায় অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মোট শ্রমিক এবং উৎপন্ন GVA-র পরিমাণও দেশের মোটের প্রায় এক-দশমাংশ। অর্থাৎ, দেশের অসংগঠিত অ-কৃষি অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলার উপর কেন্দ্রীভূত।
শুধু শীর্ষ ১০টি জেলা নয়, শীর্ষ ৫০টি জেলার ছবিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই ৫০টি জেলা দেশের মোট অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে। একইভাবে, এই জেলাগুলিতে কর্মরত শ্রমিক এবং উৎপন্ন GVA-ও দেশের মোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জেলায় প্রতি জেলায় ১ লক্ষের বেশি অসংগঠিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে, প্রায় ৯ শতাংশ জেলায় এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ হাজারের কম। অর্থাৎ, জেলা অনুযায়ী এই ক্ষেত্রের বিস্তারে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গকে ঘিরে। দেশের মাত্র ১৬টি জেলায় ৫ লক্ষের বেশি অসংগঠিত অ-কৃষি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি জেলা পশ্চিমবঙ্গের। বাকি জেলাগুলির মধ্যে তিনটি মহারাষ্ট্রের, দুটি গুজরাতের এবং কর্নাটক, তেলঙ্গানা ও উত্তরপ্রদেশের একটি করে জেলা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের দুই ২৪ পরগনার পর গুজরাতের সুরাতের ছবিও উল্লেখযোগ্য। সুরাতে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮.৫১ লক্ষ এবং সেখানে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ১৭.৪ লক্ষ। তবে উত্তর ২৪ পরগনা বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার তুলনায় সুরতে প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA অনেক বেশি। ৪.৩৯ লক্ষ টাকা।
তবে প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA-র নিরিখে দেশের সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে পুদুচেরির মাহে জেলা। সেখানে প্রতি অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের GVA ৫১.৪৭ লক্ষ টাকা। কিন্তু মাহেতে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ২,৮৫৬ এবং মোট কর্মরত মানুষের সংখ্যা ৫,৯২৭। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম হলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন অনেক বেশি।
মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার ছবিও আলাদা। সেখানে অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১.৩৩ লক্ষ এবং কর্মরত মানুষের সংখ্যা ২.৪২ লক্ষ। কিন্তু প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA ১৫.৭৯ লক্ষ টাকা- যা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার তুলনায় অনেক বেশি।
রিপোর্টে অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলা কর্মীদের নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। দেশের ২৩৭টি জেলায় এই ক্ষেত্রে মোট কর্মীর অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মহিলা। অর্থাৎ, অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্র শুধু ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, মহিলাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হিসেবেও এর ভূমিকা রয়েছে।
MoSPI জানিয়েছে, এর আগে দেশের ৪৬টি মিলিয়ন-প্লাস শহরকে কেন্দ্র করে অসংগঠিত ক্ষেত্রের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। ২০১১ সালের জনগণনার জনসংখ্যার ভিত্তিতে ওই শহরগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু জেলা-ভিত্তিক এই রিপোর্টটি আরও বিস্তৃত উদ্যোগ। MoSPI-এর National Statistics Office বা NSO জানিয়েছে, বড় পরিসরের দেশব্যাপী সমীক্ষা থেকে জেলা-স্তরের হিসাব প্রকাশের ক্ষেত্রে এটি তাদের প্রথম উদ্যোগ।
তবে রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি হল- কোথায় কতগুলি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলি কতটা অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করছে, এই দুই তথ্য এক নয়। উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং কর্মসংস্থান বিপুল হলেও প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA তুলনামূলকভাবে কম। আবার মাহের মতো জেলায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুব কম হলেও প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA অনেক বেশি। ফলে শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে কোনও জেলার অসংগঠিত অর্থনীতির শক্তি বিচার করা যায় না; তার সঙ্গে কর্মসংস্থান এবং প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA-র মতো সূচকও দেখতে হয়।