
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিনি উৎপাদনকারী দেশ। প্রায় ১০ বছর পর ফের চিনি আমদানি করতে চলেছে ভারত। বহু বছর ধরে ভারত বিপুল পরিমাণ চিনি বিদেশে রফতানি করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পরেও লক্ষ লক্ষ টন চিনি বিদেশে পাঠানোর মতো উদ্বৃত্ত মজুত থাকত। এমন পরিস্থিতি তৈরি হল কেন? কেউ কেউ বলছেন, এর জন্য দায়ী ইথানল। চিনি তৈরির পরিবর্তে সেই আখ অংশ ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছে, তাই দেশে চিনির ঘাটতি। কিন্তু সত্যিই কি বিষয়টা এতটা সরল?
প্রথমে আসল খবরটা বোঝা যাক। ২০ অগাস্ট ১০ লক্ষ মেট্রিক টন অপরিশোধিত চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্র। অপরিশোধিত চিনি হল, পুরোপুরি রিফাইন করা হয়নি। এই চিনি ভারতে এনে রিফাইন করা হবে। তারপর দেশের বাজারে বিক্রি। এই সিদ্ধান্তের সময়টাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এই চিনি আমদানি করা যাবে। আর অগাস্ট থেকে নভেম্বর, ভারতে চিনির চাহিদা বেশি থাকে। কারণটা খুব সহজ। গণেশ চতুর্থী, দুর্গাপুজো, দীপাবলি, বিয়ে, সব মিলিয়ে মিষ্টির মরসুম।
উৎসবের মরসুমে চিনির চাহিদা বাড়তে পারে বলে উদ্বিগ্ন কেন্দ্র। এরই মধ্যে দেশের বাজারে চিনির দামও দ্রুত বেড়েছে। গত ১২ দিনে খুচরো বাজারে চিনির দাম কেজি প্রতি প্রায় ৫২ টাকা থেকে বেড়ে ৬২ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে কেন্দ্রের যুক্তি, দেশে এই মুহূর্তে চিনি শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু এখনই বাজারে জোগান কিছুটা না বাড়ালে কয়েক মাস পর চাহিদা বৃদ্ধির সময় দামের উপর চাপ তৈরি হতে পারে।
ভারত আগে কতটা চিনি রফতানি করত?
২০২০-২১ অর্থবর্ষে ভারত প্রায় ৭০ লক্ষ টন চিনি রফতানি করেছিল। ২০২১-২২ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে হয়েছিল প্রায় ১১০ লক্ষ টন। তারপর ছবিটা বদলাতে শুরু করে। ২০২২-২৩ সালে রফতানি কমে দাঁড়ায় প্রায় ৬৩ লক্ষ টনে। ২০২৩-২৪ সালে তা নেমে আসে মাত্র ১ লক্ষ টনে। ২০২৪-২৫ সালে রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ লক্ষ টন। কয়েক বছরের মধ্যেই ভারতের চিনি রফতানির ছবিটা উল্টো হয়ে গেল।
তবে শুধু রফতানি কমেছে বলেই যে দেশে চিনি উৎপাদনও কমেছে, এমনটা বলা যায় না। এবার দেখা যাক, দেশে চিনির উৎপাদন কতটা হয়েছে। ২০২১-২২ সালে ভারতে প্রায় ৩৬০ লক্ষ টন চিনি উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২২-২৩ সালে তা কমে হয় প্রায় ৩৩০ লক্ষ টন। ২০২৩-২৪ সালে ৩২০ লক্ষ টন এবং ২০২৪-২৫ সালে প্রায় ২৬০ লক্ষ টন।
এবার আসল প্রশ্ন হল, আখ থেকে কতটা চিনি তৈরি হচ্ছে? কতটা ইথানল তৈরি হচ্ছে? এখন আখ শুধু চিনি তৈরিতেই ব্যবহার হয় না। মোলাসেস ব্যবহার করে ইথানলও তৈরি করা যায়। ফলে আখের একটি অংশ যখন ইথানল উৎপাদনের দিকে গেলে চিনি তৈরির জন্য আর ব্যবহার করা যায় না। পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক। ২০২০-২১ সালে ইথানলের জন্য প্রায় ২২ লক্ষ টন চিনির পরিমাণ আখ কাজে লেগেছিল। ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে হয় ৩৬ লক্ষ টন। ২০২২-২৩ সালে ৪৩ লক্ষ টন। এর পর ২০২৩-২৪ সালে তা কমে প্রায় ২৪ লক্ষ টনে দাঁড়ায়। আবার ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে হয় প্রায় ৩৪ লক্ষ টন।
ইথানল কি দায়ী?
প্রথম কথা, প্রতি বছর চিনি না উৎপাদন করে আখের ব্যবহার ইথানল তৈরিতে বেড়েই চলেছে, এমনটা বলা ভুল। দ্বিতীয়ত, কয়েক বছর আগের তুলনায় এখন ইথানল উৎপাদনের জন্য প্রায় ১০ লক্ষ টন বেশি চিনি উৎপাদনের পরিমাণে আখ ব্যবহার হচ্ছে। এবার কেউ যদি প্রশ্ন করেন, ইথানলের কারণেই কি ভারত চিনি আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে? উত্তর, শুধু ইথানলের কারণে নয়।
তবে আখের কিছুটা বেশি অংশ যদি চিনি উৎপাদনে ব্যবহার করা হত, তাহলে দেশে চিনির জোগান কিছুটা বেশি থাকতে পারত। বড় প্রশ্নও এখানেই।
আগামী দিনে পেট্রোলে ইথানলের ব্যবহার আরও বাড়াতে চাইলে, আখের ব্যবহার নিয়ে কেন্দ্রকে প্রতি বছরই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। একদিকে ইথানল, অন্যদিকে চিনি, আখের কতটা কোথায় যাবে, সেই সিদ্ধান্তই আগামী দিনে ভারতের চিনির বাজারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে মত ওয়াকিবহাল মহলের।