
ইঞ্জিনিয়ারিং মানেই কম্পিউটার সায়েন্স। ছোট কলেজ হলে তো কথাই নেই। IIT বম্বে বা IIT দিল্লির মতো জায়গাতেও ফার্স্ট প্রায়োরিটি ছিল কম্পিউটার সায়েন্স। সেই সুযোগ পাওয়াই ছিল বহু ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকের কাছে সাফল্যের মাপকাঠি। আর তা হবে না-ই বা কেন। কোটি টাকার চাকরির প্যাকেজ, স্টার্ট-আপ করার সুযোগ এবং সফটওয়্যার সেক্টরের দ্রুত উত্থান। অন্য লাইনে এত দ্রুত গ্রোথ নেই। কিন্তু ২০২৬ সালের JEE এবং IIT ভর্তিতে এখন একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। AI-এর যুগে IT-র চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আর ঠিক সেই কারণেই ফের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো কোর সাবজেক্টে আগ্রহ বাড়ছে।
প্রথম দফার JoSAA কাউন্সেলিংয়ের পরিসংখ্যানই সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। IIT বম্বেতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ওপেনিং র্যাঙ্ক এ বার ৩৮৫, যা গত বছর ছিল ২,৬৬৬। IIT দিল্লিতেও একই ছবি। সেখানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপেনিং র্যাঙ্ক ৩,০৩০ থেকে উঠে এসেছে ১৭৯-এ। IIT রুরকি এবং IIT ভুবনেশ্বরেও অনুরূপ প্রবণতা দেখা গিয়েছে। যদিও কম্পিউটার সায়েন্স এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় বিভাগ, তবু মেধাবী পড়ুয়াদের একাংশ যে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন, তা স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার। AI এখন কোড লেখা, সফটওয়্যার পরীক্ষা এবং নানা রুটিন প্রোগ্রামিংয়ের কাজ অনেকটাই স্বয়ংক্রিয় করে ফেলছে। ফলে এন্ট্রি-লেভেল সফটওয়্যার চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগে যেখানে কম্পিউটার সায়েন্সকে প্রায় নিশ্চিত ক্যারিয়ারের টিকিট বলে মনে করা হত, এখন অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের প্রশ্ন তুলছেন।
অন্য দিকে, ভারত জুড়ে চলছে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। নতুন এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রো রেল, বুলেট ট্রেন করিডর, স্মার্ট সিটি, বিমানবন্দর, নবীকরণযোগ্য শক্তি প্রকল্প এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করছে কেন্দ্র। এই পরিস্থিতিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে আজকের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং আর আগের মতো নেই। IIT-গুলিতে এখন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঠক্রমে যুক্ত হয়েছে মেশিন লার্নিং, জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, স্মার্ট মোবিলিটি এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা। অর্থাৎ কংক্রিট ও স্টিলের পাশাপাশি প্রযুক্তি এবং তথ্যবিজ্ঞানের সঙ্গেও গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এই শাখার।
বেতনের দিক থেকে এখনও কম্পিউটার সায়েন্স এগিয়ে। শীর্ষ IIT-গুলিতে কম্পিউটার সায়েন্সের পড়ুয়ারা বছরে ২০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চাকরি পেয়ে থাকেন। সেখানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গড় বেতন অনেকটাই কম। তবু শুধু প্রথম চাকরির বেতন নয়, দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার, গবেষণার সুযোগ, উচ্চশিক্ষা এবং ভবিষ্যতের চাহিদাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন বহু পড়ুয়া।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে IIT নির্বাচনেও। আগে অনেকেই নতুন IIT-তে কম্পিউটার সায়েন্সকে বেছে নিতেন পুরনো IIT-র কোর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বদলে। এখন অনেক পড়ুয়া IIT বম্বে, IIT দিল্লি বা IIT মাদ্রাজের মতো প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড, অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এবং গবেষণার সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখনও স্থায়ী প্রবণতা নয়। তবে AI, অবকাঠামো উন্নয়ন, উৎপাদন শিল্প এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলি আগামী দিনে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার ধারা বদলে দিতে পারে। ভবিষ্যতে ‘কোর বনাম টেক’ বিতর্কের বদলে ‘প্রযুক্তি-নির্ভর কোর ইঞ্জিনিয়ারিং’-ই নতুন বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।
- অপূর্বা আনন্দ
খবরটি ইংরাজিতে পড়ুন: Click Here