
এ যেন একবারে উত্তরণের রূপকথা। যেই সঙ্কটের সময় মানুষ হাল ছেড়ে দেন, সেখানে থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনি।
শান্তিপুরের তাঁতের শাড়ির কাজ করতেন বাবা-মা। কিন্তু তাঁত শিল্পে মন্দার জেরে চলে যায় কাজ। বাবা-মা চলে যান গুজরাতে। দু'বছর একা রান্না করে খেয়ে, জামাকাপড় কেচে, পড়াশোনা করে উচ্চ মাধ্যমিকে ৪৮৮ নম্বর পেয়েছেন পূর্ব বর্ধমানের কালনা মহারাজা হাই স্কুলের ছাত্র সাগর মণ্ডল। সারা রাজ্যে নবম স্থান অধিকার করেছেন তিনি। আর bangla.aajtak.in-এর সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের এই হার না মানা যাত্রাপথেরই সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলেন সাগর।
তাঁর কথায়, 'মাধ্যমিকে আমি ৬৪৬ পেয়েছিলাম। তখন থেকেই আমার ইচ্ছা আইএস হব। আইএস হতে গেলে কোনও ম্যান্ডেটরি একটা স্ট্রিমস থেকেই যে উঠে আসতে হবে, এমনটা নয়। আবার আমার পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ডটা এতটাই খারাপ যে সায়েন্স নেওয়ার মতো আর্থিক সাপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই সময় মা-বাবা এখানে কাজ হারিয়েছে। তখন গুজরাতে চলে যাবে এমন একটা সময়।'
তিনি আরও জানান, মা-বাবা গুজরাতে চলে যাওয়ার পর দু'বছর একা রান্না করে খেয়ে, জামাকাপড় কেচে, বাজার করে পড়াশোনে করতে হয়েছে। হার না মেনে এই কাজ করার জন্যই এসেছে সাফল্য।
তাঁর কথায়, 'মা-বাবা যতটা পারতেন টাকা পাঠাতেন। এইভাবেই চলত। প্রাইভেট টিউটর সবাই সাহায্য করেছেন। অনেক টিউটর মাইনে নিতেন না। অনেকে ৫০০-৬০০ টাকা ছাড়া এখন টিউটর পাওয়া যায় না। সেই জায়গায় ২০০ টাকা মাইনে নিয়েও পড়িয়েছেন শিক্ষকরা আমাকে। শিক্ষকরা সাহায্য করেছেন বলেই তো এই জায়গায় আসতে পেরেছি।'
আর তাঁর এই কীর্তিতে স্বভাবতই গর্বিত স্কুলের শিক্ষকরা। এমনকী স্কুলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ারও পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানালেন। পাশাপাশি স্যারেরা তাঁকে আর্থিক সাহায্য দেবেন বলেও খবর।
পলিটিক্যাল সায়েন্স নিয়ে পড়ার ইচ্ছে
সাগরের ইচ্ছে আইএস হওয়ার। সেই মতো এখন থেকেই তৈরি হতে চান তিনি। পাশাপাশি পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স পড়তে চান। আর এই অনার্স কোর্স তিনি কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পড়তে চান বলে জানিয়েছেন।
কীভাবে চলবে?
স্বপ্নের উড়ানের ইচ্ছে থাকলেও উচ্চ শিক্ষায় বাধা রয়েছে সাগরের সমানে। তাঁর নিজের কথায়, 'মা-বাবা দিনমজুর। ৪০০-৫০০ দিনের রোজ হয়। যেদিনকে কাজ করতে পারে না, টাকা পায় না। এইভাবে চলে। ওখানে রুম ভাড়া করে ঘর ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়। খাওয়া-দাওয়া করতে হয় এইভাবে চলে।'
তাই আগামিদিনের কথা ভেবে চিন্তায় সাগর। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে কোনও আর্থিক সহযোগিতার কথা এখন পর্যন্ত জানানো হয়নি। পাশাপাশি এমএলএ, এমপি এসে সাহায্য করবে বলে জানালেও কোনও আর্থিক সাহায্য এখনও করেননি। যদিও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ সাহায্য করেছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাই তিনি আপাতত সরকারের কাছ থেকে এককালীন আর্থিক সাহায্যের আবেদন করলেন। তাতেই তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হবে বলে মনে করছেন।
পরীক্ষার্থীদের কী বার্তা?
আগামীর উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়াদের ভাল রেজাল্ট করার টিপস দিলেন সাগর। তাঁর কথায়, 'প্রত্যেকদিন স্কুলে যেতে হবে। ক্লাসগুলো ভালো করে করতে। না বুঝতে পারলে তাদের জিজ্ঞাসা করে নিতে। আর প্রধান বিষয় হল টেক্সটচুয়াল বই পড়তে হবে। দু'টো তিনটে বই পড়ে একটা বিষয়ে একটা সঠিক সিদ্ধান্তে এসে নিজের নোট তৈরি করতে হবে। লেখাটা হবে টেক্সটচুয়াল ১০০ পার্সেন্ট পারফেক্ট এবং ১০০ পার্সেন্ট মার্কস ক্যারি করা যাবে। কারণ, পরীক্ষার প্রশ্নে লেখা থাকে লেখাটা হবে ব্রিফ, টু দ্য পয়েন্ট অ্যান্ড একুরেট। এই তিনটে শব্দ প্রত্যেকটা পরীক্ষার খাতায় লেখা থাকে।'