
শুনশান রাত। চারপাশ অন্ধকার। হঠাৎ কোথাও থেকে ভেসে এল কুকুরের কান্নার আওয়াজ। এমন শব্দ শুনলেই অনেকের মনে কৌতূহল, কুকুরটি কাকে দেখে কাঁদছে? এখনও লোকবিশ্বাস, রাতে কুকুরের কান্নার অর্থ কোনও অঘটন বা ভূত-প্রেতের উপস্থিতি। কিন্তু সত্যিই কি কুকুর ভূত বা আত্মা দেখতে পারে? কুকুরের এমন ডাক কি কোনও অশুভ ঘটনার পূর্বাভাস?
রাতে কুকুরের ডাকই বেশি শোনা যায় কেন?
আসলে কুকুর শুধু রাতেই আওয়াজ করে, এমনটা নয়। দিনের বেলায় আশপাশে এত বেশি শব্দ থাকে যে অনেক সময় কুকুরের ডাক সেই কোলাহলের মধ্যে চাপা পড়ে যায়। রাতে যখন পরিবেশ শান্ত হয়ে আসে, তখন কুকুরের আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যায়। এছাড়া কুকুরের শ্রবণক্ষমতাও মানুষের থেকে আলাদা। আমেরিকান কেনেল ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, মানুষ যে ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ শুনতে পারে, কুকুর তার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ শুনতে সক্ষম। এমন কিছু শব্দও তাদের কানে পৌঁছয়, যা মানুষ শুনতেই পায় না। ফলে অনেক সময় মনে হতে পারে, কুকুরটি কোনও কারণ ছাড়াই কাঁদছে। অথচ সম্ভবত সে এমন কোনও শব্দ শুনছে, যার প্রতিক্রিয়ায় সে ডাকছে।
অন্য কুকুরের সঙ্গে যোগাযোগ
কুকুরের কাছে দীর্ঘ আওয়াজ করাও এক ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম। কোনও দূরের এলাকায় একটি কুকুর ডাকলে আশপাশের অন্য কুকুরও তার জবাব দিতে পারে। ভিসিএ অ্যানিম্যাল হসপিটালসের মতে, অন্য কুকুরের ডাক বা উচ্চস্বরের কোনও শব্দের প্রতিক্রিয়াতেও কুকুর ডাকতে পারে।
রাতে একটি কুকুর ডাকল এবং কিছুক্ষণ পর আশপাশের আরও কয়েকটি কুকুরও কান্নার মতো আওয়াজ করতে শুরু করল, মানেই সেখানে কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে, এমন নয়। এটি কুকুরদের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগও হতে পারে।
নিজের উপস্থিতি জানায়
কুকুর শুধু মানুষের সঙ্গেই নয়, অন্য কুকুরের সঙ্গেও আওয়াজের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। হতে পারে যে, কুকুরটি অন্য কুকুরদের জানাচ্ছে, সে ওই এলাকায় রয়েছে। নেকড়েরাও দীর্ঘ আওয়াজের মাধ্যমে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পোষ্য কুকুরের মধ্যেও এই আচরণের কিছুটা দেখা যায়। তাই আমাদের কানে সেই আওয়াজ কান্নার মতো শোনালেও কুকুরটির কাছে তার অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
একাকিত্ব বা ভয়
কোনও কুকুর দীর্ঘ সময় একা থাকলে তার মালিক বা অন্য কুকুরদের ডাকার জন্যও আওয়াজ করতে পারে। একাকিত্ব এবং উদ্বেগ কুকুরের ডাকের অন্যতম কারণ হতে পারে।
নিজের এলাকা রক্ষায়
নিজের আশপাশের এলাকা নিয়েও কুকুর যথেষ্ট সতর্ক থাকে। কোনও অপরিচিত ব্যক্তি, অন্য প্রাণী বা অস্বাভাবিক কোনও নড়াচড়া টের পেলে তারা আওয়াজ করে। কিছু কুকুর আওয়াজ করে অন্য প্রাণীদের জানান দিতে পারে যে, ওই এলাকা ইতিমধ্যেই তাদের দখলে রয়েছে। নিজের এলাকার উপস্থিতি জানান দেওয়া এবং অন্য প্রাণীকে দূরে থাকার সংকেত দেওয়া।
ব্যথা বা শারীরিক সমস্যা
সাধারণত যে কুকুরটি শান্ত থাকে, সে যদি হঠাৎ রাতে একটানা কান্না শুরু করে, তা হলে বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি আওয়াজ করা কখনও কখনও ব্যথা বা শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। এর সঙ্গে যদি অস্থিরতা, খাওয়ার পরিমাণ কমে যাওয়া, অবসাদ, হাঁটাচলায় সমস্যা বা আচরণে আচমকা পরিবর্তন দেখা যায়, তা হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভাল।
তা হলে ভূত-আত্মার ধারণা কোত্থেকে?
কুকুরকে ভূত-প্রেত বা আসন্ন অঘটনের সঙ্গে যুক্ত করার বিশ্বাস বেশ পুরনো। এর কারণ হতে পারে, কুকুর এমন কিছু শব্দ বা নড়াচড়াতেও প্রতিক্রিয়া জানায়, যা মানুষ টের পায় না। শুধু ভারতেই নয়, বহু দেশের সংস্কৃতিতেই এই বিশ্বাস রয়েছে। কিন্তু কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়ার সঙ্গে কুকুরের কান্নার কোনও প্রমাণ নেই।