
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক অধ্যায় রচিত হল। হুগলির তীর থেকে দার্জিলিংয়ের পাহাড়, রাজ্যজুড়ে এখন পরিবর্তনের হাওয়া। ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনিতে মুখর রাজনীতি যেন এক নতুন দিশার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বহু দশকের অপেক্ষার পর অবশেষে বাংলার মাটিতে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছল বিজেপি।
এই জয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়, এটি এক গভীর প্রতীকী মুহূর্ত। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমিতে প্রথমবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি। দলের কাছে এটি প্রতিষ্ঠাতার প্রতি একপ্রকার ‘ঐতিহাসিক ঋণ শোধ’-এর সমান।
বাংলায় বিজেপির উত্থান: সংখ্যার বাইরে এক বার্তা
নির্বাচনী প্রবণতা বলছে, বিজেপি ১৯০-রও বেশি আসনে এগিয়ে থেকে সরকার গঠনের পথে। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর তৃণমূল কংগ্রেস পিছিয়ে পড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে স্পষ্ট, রাজ্যের মানুষ এবার ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন।
এই ফলাফল শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এক আদর্শগত পরিবর্তনের প্রতিফলন বলেই মনে করছেন অনেকেই। ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’, যার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ, তা নতুন করে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বাংলার একাংশের ভোটারদের মধ্যে।
আদর্শ থেকে বাস্তব: দীর্ঘ পথচলার ফসল
১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে আদর্শিক পথচলা শুরু হয়েছিল, সেটিই পরে বিজেপির ভিত্তি গড়ে তোলে। সেই সূত্রেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে বিজেপির ‘জনক’ বলা হয়।
বহু বছর ধরে বাংলায় বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ তকমা সহ্য করতে হয়েছে। বাম শাসনের ৩৪ বছর এবং তৃণমূলের ১৫ বছরে দলটি প্রান্তিক শক্তি হিসেবেই ছিল। কিন্তু ২০২৬-এর ফলাফল দেখিয়ে দিল, রাজনৈতিক সমীকরণ কত দ্রুত বদলাতে পারে।
নেতৃত্ব ও প্রচারের প্রভাব
নির্বাচনী প্রচারে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ-এর সক্রিয় ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়। একদিকে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর বার্তা, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার আখ্যান, এই দ্বৈত কৌশল বিজেপির পক্ষে বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে।
মাঠপর্যায়ে সংগঠনের জোর, বুথভিত্তিক পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক প্রচার, সব মিলিয়ে বিজেপি এই নির্বাচনে নিজেদের শক্ত ভিত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
তৃণমূলের পতন: পরিবর্তনের ইঙ্গিত
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের শাসনের পর তৃণমূলের এই ফলাফল রাজনীতিতে এক বড় ধাক্কা। ‘মা, মাটি, মানুষ’-এর স্লোগানকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিজেপি নিজেদের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে।
এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা
স্বাধীনতার পর এই প্রথম বাংলায় বিজেপি সরকার গঠনের পথে। ফলে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি শুধু একটি জয় নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
দলের কাছে এই সাফল্য যেমন ক্ষমতায় আসার আনন্দ, তেমনই এটি প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্নপূরণের প্রতীক। দীর্ঘ ৭৫ বছরের অপেক্ষার পর শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় ‘পদ্ম’ ফুটেছে, এটাই এখন বিজেপি শিবিরের সবচেয়ে বড় বার্তা।