
পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ভোট আর কয়েকদিন বাকি। তার আগেই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিক এবং দেশের আধা সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ডিরেক্টর জেনারেল কলকাতার সল্টলেক সিটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এই বৈঠকে তারা পশ্চিমবঙ্গ ভোটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিশদে আলোচনা করেন। কলকাতায় আয়োজিত এই উচ্চস্তরের বৈঠকে CRPF, BSF, CISF, SSB এবং ITBP-র ডিরেক্টর জেনারেলরা অংশ নেন। একবারে গ্রাসরুট লেভেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন।
সূত্রের খবর, এবার ভোট বাংলায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লক্ষের কাছাকাছি। শুধু তাই নয়, নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে CRPF-এর কাছে থাকা বুলেটপ্রুফ ‘মার্কসম্যান’ গাড়িগুলিও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে।
এই বৈঠকে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (CAPF)-এর প্রধানরা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং ভয়মুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা কৌশল তৈরি করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল না। বরং এর মাধ্যমে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি একটি ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
আসলে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমদফার ভোট হল ২৩ এপ্রিল। সেই দিন ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। সেই প্রেক্ষিতে এই বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এই বৈঠকের উদ্দেশ্য হল প্রতিটি ভোটার নির্ভয়ে, চাপমুক্ত পরিবেশে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
CRPF-এর থার্ড সিগন্যাল সেন্টার সল্টলেকে এই যৌথ নিরাপত্তা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সব বাহিনীর শীর্ষ আধিকারিকরা একত্রিত হয়েছিলেন। এই বৈঠকে রাজ্য পুলিশের শীর্ষকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনের পুলিশ উপদেষ্টারাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের সূচনা করেন IG CRPF (স্টেট কোঅর্ডিনেটর), যেখানে গ্রাসরুট লেভেলে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং তার সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল (QRT) মোতায়েন, সংবেদনশীল এলাকায় নজরদারি এবং সম্ভাব্য নাশকতা রুখতে অ্যান্টি-সাবোটাজ ব্যবস্থার পর্যালোচনা করা হয়। আধিকারিকরা জোর দিয়ে বলেন, একটি 'ইন্টিগ্রেটেড সিকিউরিটি গ্রিড'-এর মাধ্যমে সব সংস্থা স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করবে।
'ওয়ান ইলেকশন ফোর্স'-এর বিষয়ে গুরুত্ব দেন CISF-এর ডিরেক্টর জেনারেল প্রবীর রঞ্জন। তিনি বলেন, এই দায়িত্ব শুধুমাত্র নিরাপত্তা নয়, গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে জড়িত। সব বাহিনীকে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যেখানে শৃঙ্খলা, সমন্বয় এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম দফার ভোটের আগে বিশেষ প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। CAPF নেতৃত্ব 'Leadership by Example' নীতি অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। আধিকারিকদের বলা হয়েছে, তারা যেন সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং তাদের অধীনস্থদের জন্য উচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করেন। সব জওয়ানকে নির্বাচন ডিউটির হ্যান্ডবুক কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে নির্বাচন কমিশনের সমস্ত নির্দেশিকা সঠিকভাবে পালন করা যায়। পাশাপাশি সংবেদনশীল এলাকায় বিশেষ নজরদারি, ফ্ল্যাগ মার্চ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে ‘মার্কসম্যান’ গাড়িগুলিও রাজ্যের বিভিন্ন অংশে মোতায়েন থাকবে। ‘মার্কসম্যান’ একটি অতি সুরক্ষিত যান। এটির বাহ্যিক কাঠামো শক্তিশালী স্টিল দিয়ে তৈরি। তাই এতে গুলি চালালেও ভিতরে উপস্থিত জওয়ানরা সুরক্ষিত থাকে। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর বুলেট-রেজিস্ট্যান্ট বডি, যা AK-47, SLR বা INSAS রাইফেলের গুলিও প্রতিরোধ করতে সক্ষম। কাছ থেকে গুলি চালালেও এটি সুরক্ষা দেয়।
এই গাড়িতে বিশেষ ধরনের রান-ফ্ল্যাট টায়ার ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ টায়ারে গুলি লাগলেও বা বাতাস বেরিয়ে গেলেও গাড়িটি কিছু দূর পর্যন্ত চলতে পারে, ফলে অপারেশনের সময় জওয়ানরা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাতে পারেন। এই যান শুধু শহরে নয়, দুর্গম গ্রামীণ এলাকাতেও সহজে চলতে পারে। এর উচ্চতা এবং শক্তিশালী সাসপেনশন এটিকে সব ধরনের রাস্তার জন্য উপযুক্ত করে তোলে।
নির্বাচনের সময় উত্তেজনা বা হিংসার সম্ভাবনা থাকলে নিরাপত্তা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ‘মার্কসম্যান’ গাড়ি নিরাপদভাবে বাহিনীকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দিয়ে দ্রুত অ্যাকশন নিতে সাহায্য করে।
সূত্রের খবর এবার প্রায় ২০০ কোম্পানি মহিলা কমান্ডো বিশেষভাবে মোতায়েন করা হচ্ছে। তাদের আলাদা করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচন পরিচালনার জন্য ৫ দিনের বিশেষ সেশনও আয়োজন করা হয়েছে। শুধু ভোটের দিন নয়, ভোটের পরেও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাদের রাখা হবে।
সূত্রের খবর, নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ভোটের পরেও যাতে কোনও ধরনের হিংসা না হয়। তার জন্য ৫০০-র বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর কোম্পানি রাজ্যে মোতায়েন থাকবে। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর ঘটে যাওয়া হিংসার অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সময়ের ঘটনাগুলির পরিপ্রেক্ষিতে এবার আগাম সতর্কতা হিসেবে এই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।