
ঘরে ফিরতে হুলস্থুল। ভোটটা দিতেই হবে! একটাই চিন্তা, এ বছর ভোট না দিলে নাকি তালিকায় নাম থাকবে না! তাই কাজ থাক শিকেয়, আগে ভোটটা দিতে হবে। বিহার থেকে অসম, হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের এখন গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গ। টিনের বাক্সে ভরা জীবন। ম্যাজিক ভ্যানের ভিড়ে গাদাগাদি করেই। ট্রেনে ভিড়, বাসে ঝুলছে। ভোটটা দিতেই হবে এ বছর! কাজ গেলে যাক, ভোটার লিস্টে নাম থাকা দরকার। চুম্বকে এটাই এই মুহূর্তে বাংলা থেকে ভিনরাজ্যে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের হকিকত। সৌজন্যে অবশ্যই স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বা SIR। আরও একটি আশঙ্কাও রয়েছে। সেটি হল NRC।
'বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ভোট দিতে এসেছি'
যেমন দিনহাটায় দেখা গেল, চাপা উদ্বেগ ও আতঙ্ক চোখে মুখে। অসম থেকে সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চলে এসেছেন শাহ আলম শেখ। SIR-এ তাঁদের এ বছর নাম উঠেছে। তড়িঘড়ি ভোট দিতে এসেছেন। বলছেন, 'যদি পরের বার SIR হয়, তাই ২০২৬ সালের ভোটার তালিকা যত্ন করে রাখতেই হবে। বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ভোট দিতে এসেছি।'
অন্যদিকে, দিনহাটার বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিক বিনয় রায় গুজরাত থেকে ফিরে জানালেন, বাংলায় কাজের অভাবেই বাইরে যেতে হয়। 'গুজরাতের উন্নয়ন দেখেছি, যিনি এখানে সেরকম উন্নয়ন করবেন তাকেই ভোট দেব,' বলেন তিনি। একইভাবে বিহার থেকে রাতভর যাত্রা করে আসা মহম্মদ আশরাফ আলি ২০১৬ সালের নোটবন্দির সময়কার কষ্টের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বর্তমান রাজ্য নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, 'প্রাণ গেলেও মমতাকেই ভোট দেব।'
'মোদীকে ভোট দিলে সব কিছু বেচে দেওয়া হবে, দিদিই ভাল'
এই প্রবণতা শুধু কোচবিহারেই নয়, শিলিগুড়িতেও দেখা যাচ্ছে। বিজেপি-শাসিত রাজ্য ও ভিনদেশ নেপাল থেকে ফেরা শ্রমিকদের অনেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষেই মত দিচ্ছেন। স্থানীয় কর্মসংস্থানের অভাব স্বীকার করেও তারা 'শান্তি' ও 'মতপ্রকাশের স্বাধীনতা'-কে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এক শ্রমিক বলেন, 'মোদীকে ভোট দিলে সবকিছু বেচে দেওয়া হবে, দিদিই ভাল।' আরেকজনের আশঙ্কা, 'বাইরে কাজ করা অনেকেই ভোট দিতে ফিরতে পারবেন না, তাই আমাদেরই দাঁড়াতে হবে।'
এই পরিযায়ীদের যাত্রার ছবি চোখে পড়ার মতো। দিনহাটা ও কোচবিহারগামী বাসের ছাদে বাঁধা সাইকেল, ভেতরে সামান্য মালপত্র। ঠিকাদারদের সঙ্গে আগেভাগে হিসাব চুকিয়ে তারা ফিরেছেন শুধু ২৩ এপ্রিলের সময়সীমার আগে পৌঁছতে। তাদের কাছে এই ভোট শুধু প্রতিনিধি বাছাই নয়, বরং অস্তিত্বের প্রমাণপত্র। উত্তরবঙ্গের সড়কপথে এখন একটাই বার্তা, নিজের অস্তিত্ব ও অধিকারের প্রশ্নে দূরত্ব কোনও বাধা নয়।