
২০২১ সালের ভোটে বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বাঙালি অস্মিতা’র ভাষ্য তৈরি করেছিল তৃণমূল। ২০২৪ সালের ভোটেও শাসকদলের স্লোগান ছিল, ‘জনগণের গর্জন, বাংলা বিরোধীদের বিসর্জন।’ ২০২৬ সালেও শাসক তৃণমূল এই ‘ধারা’ই বজায় রেখেছে। প্রতিটি ভোটপ্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে দেখা যাচ্ছে বিজেপি বাংলা বিরোধী। বিজেপি বাংলায় এলে মাছ-মাংস-ডিম খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। প্রতিটি জনসভাতেই এই কথাটা বলতে দেখা যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এই আবহে পাল্টা মাছ নিয়ে প্রচারে নেমেছেন বিজেপি নেতারা। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে মাছ এখন আর শুধু খাবারের প্লেটে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি প্রচারের মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নিজের সংস্কৃতির প্রতি টান দেখাতে এবং ‘বহিরাগত’ তকমা ঘোচাতে বিজেপি প্রার্থী, কর্মী ও নেতারা মাছকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এমনকি বিজেপির অবাঙালি নেতাদেরও প্রকাশ্যে মাছ খেতে দেখা যাচ্ছে। মাছের প্রসঙ্গ তুলেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও।
বাংলা দখল করতে টানা প্রচার চালাচ্ছেন মোদী। মানুষের মন জিততে বিভিন্ন রকম কৌশল নেওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পুরনো অভ্যাস। বস্তুত সার্বিকভাবে প্রচারে মানুষের মনজয়ের কৌশল সম্ভবত তাঁর চেয়ে বেশি ভালো করে ভূ-ভারতে আর কেউ অর্জন করতে পারেননি। বাংলার ভোটের ক্ষেত্রেও এবার ছকভাঙা প্রচারে দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীকে। এতদিন জনসভা, রোড-শোতেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য ছিলেন। দিল্লি থেকে আসতেন, সভা করতেন, বড়জোর রোড শো করতেন, চলে যেতেন। তাতে বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্মকরণের বেশি সুযোগ ছিল না। তৃণমূল যে এতদিন তাঁকে 'বহিরাগত' বলে আসছে, সেই প্রচার ভাঙার কোনও চেষ্টা দেখা যেত না। কিন্তু ছাব্বিশে সেই চেষ্টাটা পুরোদস্তুর শুরু করেছেন মোদী।
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ‘বাঙালি অস্মিতা’কে হাতিয়ার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এদিকে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের কোনও বিরোধ নেই, সেই বার্তা দিতে মরিয়া বিজেপিও। সেই কৌশলেরই অঙ্গ হিসেবে এবার রামনাম ছেড়ে বিজেপি নেতারা আওড়াচ্ছেন দুর্গা-কালী। আবার বাঙালিয়ানার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে মোদী কখনও ঝালমুড়ি খাচ্ছেন, কখনও বা খাচ্ছেন গঙ্গার হাওয়া। রাজ্যের প্রথম দফার ভোটের দিনই তিনি চলে যান বেলুড়ে। পরে এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, 'যে খানে স্বামী বিবেকানন্দ ধ্যান করতেন, আজ সেখানে যেতে পেরে আমি অভিভূত।' বারবার বাংলার মনীষীদের নাম-বিভ্রাটের মাঝে বস্তুত সবটাই স্ক্রিন ক্যাপচার এবং বাঙালিয়ানা দেখানোর চেষ্টা, বলছে বিরোধীরা। তাই প্রধানমন্ত্রীর হাতে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি উপহার হিসেবে তুলে দেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এর আগে রাজ্যে মোদীর সভামঞ্চে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি উপহার দিয়েছিলেন শমীক। রবিবার প্রধানমন্ত্রীর রোড শোয়ের মাঝে আবার সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁকা মহানায়ক উত্তমকুমারের ছবি তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতে।
স্পষ্টতই দৃশ্যমান, ২০২৬-এর এই বিধানসভা নির্বাচনে ‘বাঙালি অস্মিতা’ যখন শাসকদলের প্রধান অস্ত্র, তখন গেরুয়া শিবিরও এখন সংস্কৃতির মোড়কে নিজেদের মেলে ধরতে মরিয়া। বিজেপি যে বাঙালির সংস্কৃতির পরিপূরক— এই বার্তাই এখন প্রতিটি প্রচারে সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। আর এই কৌশলের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর হাতে তুলে দেওয়া বাঙালির মহীরুহদের নানা প্রতিকৃতি।
ভোটের আগে মোদীর এই বাঙালিয়ানা নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্র বলছেন, 'নির্বাচনের সময় এই আচরণ করে থাকেন প্রায় সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাই। মোদীর আগে মনমোহন সিং ছাড়াও অন্যান্য প্রধানমন্ত্রীরা এই পথেই হেঁটেছেন। উত্তর পূর্বের রাজ্য বা রাজস্থানে গিয়ে সেখানকার পোশাক পরা বা সেই ভাষায় কথা বলা, আগেও রাজনীতিতে দেখা গেছে। অ-বিজেপি রাজ্যগুলি যেমন বাংলা ও তামিলনাড়ুতে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ কাজ করে। আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে এই নিয়ে লড়াই করতে হয় জাতীয়দলগুলিকে। আঞ্চলিকতার পক্ষে কৌশল নিতে হয়।'
তৃণমূল কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তীর বক্তব্য, 'কোনও বাঙালিকে এপ্রিলে শাল নিতে হয় না, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সান্যাল বলতে হয় না। বিজেপিকে বাঙালি সাজতে হয় বাংলা বিরোধী বলেই। তাই আলাদা করে বাঙালি প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু চেনা বামুনের পৈতে লাগে না। বাঙালির মাছ-ভাত কেড়ে নেবে বিজেপি। তবে বেড়াল তপস্বী হওয়ার চেষ্টা ৪ মে বিফলে যাবে মোদীজির।'
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বাঙালির অস্মিতা মানে শুধু ভাষা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্র-নজরুল, প্রিয় মহানায়ক আর বাঙালির চিরাচরিত খাদ্যরসিকতা। এই ‘মাছ-মিষ্টি-মোর’-এর মেলবন্ধনে বিজেপি এখন চাইছে তাদের রাজনৈতিক দর্শনকে বাঙালির অন্দরে নিঃশব্দে চালান করে দিতে।