
বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সঙ্ঘ পরিবারের নীরব কিন্তু সুসংগঠিত তৎপরতা। যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁদের জোরালো প্রচারে শিরোনাম দখল করছেন, তখন নীরবে, নিভৃতে মাঠে নেমে পড়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস। লক্ষ্য, রাজ্যের হিন্দু ভোটকে একসূত্রে গেঁথে ফেলা।
সূত্রের খবর, দীর্ঘদিন সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে রাখলেও, এবারের নির্বাচনে আরএসএস তাদের সহযোগী সংগঠনগুলিকে সক্রিয় করে তৃণমূল স্তরে বিস্তৃত প্রচার চালাচ্ছে। বাড়ি বাড়ি যোগাযোগ, ছোট বৈঠক, চায়ের দোকান কিংবা মন্দির চত্বরে ঘরোয়া আলোচনা, সব মিলিয়ে এক গভীর জনসংযোগ কৌশল নিয়েছে তারা। বড় জনসভার বদলে এই ছোট ছোট বৈঠকেই জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে বার্তা আরও ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছে যায়।
জানা যাচ্ছে, এই প্রচারের মূল সুর, এই নির্বাচন ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’। স্বয়ংসেবক, সন্ন্যাসী ও বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা মানুষের কাছে গিয়ে একটাই বার্তা দিচ্ছেন, হিন্দু সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই ভোটের ওপর। প্রায় ২৫০টি আসনে লক্ষাধিক ‘ভোটার সচেতনতা’ সভা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে বলে দাবি।
সঙ্ঘ সূত্রে খবর, আরএসএস বাংলাকে তিনটি ভাগে, উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণে ভাগ করে কৌশল সাজিয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে তাদের শাখার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪,৩০০-এ। যা আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি। সূত্রের খবর, ১৫ বছর আগে বাংলায় আরএসএস-এর শাখার সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৩০টি। এই বিপুল সাংগঠনিক শক্তিকেই কাজে লাগিয়ে তারা গ্রামীণ ও শহুরে স্তরে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে শোনা যাচ্ছে।
প্রচারের একটি বড় দিক হল ‘সরাসরি রাজনীতি’ এড়িয়ে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া। ‘পঞ্চ পরিবর্তন’, সামাজিক সম্প্রীতি, পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিবেশ সচেতনতা, স্বদেশী ভাবনা ও নাগরিক দায়িত্ব। এই পাঁচটি বিষয়কে সামনে রেখে প্রচার চালানো হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি ছোট ছোট সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ গড়ে তুলে নির্দিষ্ট বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ভোটের দিন নিয়েও বিশেষ কৌশল নেওয়া হয়েছে। 'আগে ভোট, পরে সকালের জলখাবার', এই বার্তা দিয়ে সকালেই ভোট দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ‘নোটা’ এড়িয়ে ভোটদানের আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে ভোটের বিভাজন কমে।
অন্যদিকে, এই সক্রিয়তা নিয়ে সরব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি আরএসএস-কে নিশানা করে ভোটারদের সতর্ক থাকার বার্তা দিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচন ক্রমশ দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের সংঘাতে পরিণত হচ্ছে। একদিকে তৃণমূলের উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক রাজনীতি, অন্যদিকে অভিযোগ, গেরুয়া শিবিরের নীরব কিন্তু গভীর মেরুকরণের চেষ্টা। বড় মঞ্চের ভাষণের আড়ালে, এই নীরব ঘরোয়া প্রচারই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।