Advertisement

Parivartan in Bengal: উল্টে দেখুন, যাঁরা 'পাল্টি' খাওয়ার পথে, বাংলায় কত 'পরিবর্তন'!

এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হল, পশ্চিমবঙ্গের পালা বদলের পরে রং বদলে ফেলার চেষ্টা করা অথবা রাতারাতি শিবির বদল করে ফেলা সেই সব ব্যক্তিত্বদের একবার চিনে নেওয়া। বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিধানসভা ভোটে জেতার ৪৮ ঘণ্টাও কাটেনি এখনও। তাতেই পশ্চিমবঙ্গে পাল্টি খাওয়ার হিড়িক পড়ে গিয়েছে।

রং বদলের হিড়িক বাংলায়রং বদলের হিড়িক বাংলায়
Aajtak Bangla
  • কলকাতা ,
  • 06 May 2026,
  • अपडेटेड 3:44 PM IST
  • টলিউডে 'পাল্টি' খাওয়ার কী খবর?
  • বুদ্ধিজীবীদের কী খবর?
  • সাংবাদিক মহলে কী চলছে?

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, 'উল্টে দেখুন, পাল্টে গেছে।' একটি জনপ্রিয় বাংলা ম্যাগাজিনের ট্যাগও ছিল এই প্রবাদ। পশ্চিমবঙ্গে আপাতত ওই প্রবাদটি ট্রেন্ডিং সোশ্যাল মিডিয়ায়। কে কে পাল্টি খেলেন? তার হিসেব গোনা চলছে বেশ। কারও সুর নরম। কেউ আবার প্রতিবাদী। মোদ্দা বিষয়, স্লোগান একটাই, 'চলো পাল্টাই'। 

এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হল, পশ্চিমবঙ্গের পালা বদলের পরে রং বদলে ফেলার চেষ্টা করা অথবা রাতারাতি শিবির বদল করে ফেলা সেই সব ব্যক্তিত্বদের একবার চিনে নেওয়া। বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিধানসভা ভোটে জেতার ৪৮ ঘণ্টাও কাটেনি এখনও। তাতেই পশ্চিমবঙ্গে পাল্টি খাওয়ার হিড়িক পড়ে গিয়েছে। শুধু কি তাই? সেই সব বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, যাঁরা কট্টর তৃণমূলপন্থী হিসেবে পরিচিত, তাঁদের অ-তৃণমূলীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় একেবারে ঝেড়ে কাপড় পরাচ্ছে! যার নির্যাস, অনেকে তো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রোফাইলই ডিঅ্যাক্টিভেট করে ফেলেছেন। এখন অপেক্ষা হল,তাঁরা যখন পরবর্তীকালে অ্যাক্টিভ হবেন, কী রং বেছে নেবেন? চলুন, আমরাও একটু উল্টে দেখি, কে কোথায় পাল্টাচ্ছেন?

টলিউডে 'পাল্টি' খাওয়ার কী খবর?

টলিউড দিয়েই শুরু করা যাক। এই তো সে দিন, তৃণমূল কংগ্রেসের 'পরম' বন্ধু হলেন অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। মাস খানেক আগের কথা। তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রার্থী ঘোষণার দিনই জোড়াফুল শিবিরে যোগ  দিয়েছিলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বর্তমানে রাজ্যে অতীত। সুর নরম করে ফেললেন পরমব্রতও। একটি বাংলা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, 'একটা সরকার যখন ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধী একটা হাওয়া তৈরি হয়। এই সরকারের যেমন বেশ কিছু ভাল কাজ, ভাল প্রকল্প ছিল, ঠিক তেমনই তাদের এক শ্রেণির কর্মীদের ঔদ্ধত্য, কিছু বিধায়কের জুলুমবাজি, মানুষের জীবনে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা, একই সঙ্গে চুরি-দুর্নীতি, এ গুলো তো অস্বীকার করা যায় না। কিছু বিধায়কের জুলুমবাজি মানুষের কাছে মমতা বন্দোপাধ্যায়র ভাল কাজকে গৌণ করে দিয়েছে। এটা তৃণমূলের অতি বড় সমর্থকও স্বীকার করবেন। সেখানে আমি তো তৃণমূল পার্টির সদস্যও নই, কর্মীও নই। আসলে মানুষের মধ্যে একটা রাগ ছিল। সেই রাগটা থাকা স্বাভাবিক। আসলে তৃণমূলের কিছু নেতামন্ত্রী এই সব জুলুম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাল কাজকে ছাপিয়ে গিয়েছে।' 

Advertisement

আবার দেখুন আরেক অভিনেতা সৌরভ দাস ভোল বদলে ফেললেন। সিরিজের 'মন্টু পাইলট' এবার কি বিজেপির প্লেনে চড়ার চেষ্টা শুরু করে দিলেন? ফেসবুক পোস্টে সৌরভ লেখেন, 'আমি যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছি—আমাকে বাদ দেওয়ার, আমাকে নিষিদ্ধ করার সেই হুমকি আর ভয়, যে কাজটা আমি সবচেয়ে ভাল পারি, সেখান থেকেই আমাকে সরিয়ে দেওয়ার সেই আতঙ্ক। আমি কীভাবে রোজগার করব, সেই চিন্তায় ভীত হয়ে পড়া, আমাকে কি তবে অন্য কোনও ইন্ডাস্ট্রিতে একেবারে শূন্য থেকে, নতুন করে শুরু করতে হবে? আর আমার পরিবারের কী হবে, যারা আমার দিকেই তাকিয়ে থাকে? আর তারপর সেই ভ্রমণের কষ্ট— আমার সিনেমাটা দেখার জন্য বন্ধুর সাথে সুদূর মুম্বই পর্যন্ত যাওয়া। সেখানে বসে এই ভেবে কেঁদে ফেলা যে, আমি আমার পরিবারের সাথে (যাদের কিনা শেষমেশ টাটানগরে যেতে হয়েছিল তাদের ছেলের বলিউডের সিনেমায় অভিনয় দেখা জন্য— যা নিয়ে তারা ভীষণ গর্বিত ছিল) কিংবা আমাকে ভালোবাসে এমন মানুষদের সাথে আমার জীবনের এই বিশাল সাফল্যটা উদযাপন করতে পারছি না। এই কষ্টগুলোর কথা আজ বলাটা বড্ড জরুরি হয়ে পড়েছিল। বিশ্বাস করুন, আমার মতো সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে জাতীয় স্তরের কোনও সিনেমার পোস্টারে নিজের মুখ দেখতে পাওয়াটা আমার কাছে এক বিশাল বড় অর্জন। এ এক এমন সফর, যা বহু ত্যাগ আর কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।'

ওদিকে উত্তরপাড়ার প্রাক্তন বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিকের সুর একদম বদলে গিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের কাঞ্চন এখন বলছেন, 'এই যে ৭৪ জন দক্ষ বিধায়ককে সরানো হল, আমি আমার কথা বলছি না, আমি তুলনায় নতুন, তাঁদের সরিয়ে দিয়ে, নতুনদের আনা হল, সেটাও তো একটা কারণ হতে পারে! দলটা মানুষের থাকলে হয়, কিন্তু সেটাকে জোর করে কর্পোরেট বানানোর চেষ্টা করলে মুশকিল!' মনে করালেন লোকসভা নির্বাচনের সময়ে সেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে তাঁকে অপমান করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন। বলছেন, 'এখনও বলব, আমাকে দিনের আলোয় এত জনের মাঝে যেভাবে অপমানিত হতে হয়েছিল, সেটা যে অপমানিত হয়, শুধু সে-ই বোঝে। তখন কিছু বলিনি। বললে দলের অসম্মান হত। মুখ্যমন্ত্রীর অসম্মান হত। আজকে আর নতুন করে কিছু বলব না। শুধু এটুকু বলি, উনি যদি মানুষের ধর্ম পালন করেন, যদি মানুষ হন, তা হলে আজ টের পেয়েছেন ঔদ্ধত্যের ফল কী হয়।' কাঞ্চনের স্ত্রী শ্রীময়ী চট্টোরাজ ফোনে বললেন, 'কাঞ্চন আর রাজনীতিতেই থাকবে না। ওঁকে বিজেপি থেকে অফার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ও আর রাজনীতি থাকতে চায় না। শুধুমাত্র অভিনয়তেই ফোকাস করবেন।'

কয়েকজন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় মত প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে ‘ব্যান কালচার’ অনেক দিন ধরেই প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এক রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা প্রায়শই অন্য মতাদর্শের শিবিরে কাজের সুযোগ পান না, এমন অভিযোগ নতুন নয়। এখন রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতি উল্টো দিকে ঘুরতে পারে, এই প্রত্যাশা থেকেই আগে বঞ্চিত হওয়া অনেক শিল্পী প্রকাশ্যে নিজেদের মতামত জানাতে শুরু করেছেন।

অন্যদিকে, ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠপুত্র হিসেবে পরিচিত প্রসেনজিত্‍ চট্টোপাধ্যায়ের মতো তারকারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক রঙের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে চান না এবং কাজের ক্ষেত্রকে রাজনীতির বাইরে রাখতেই পছন্দ করেন। ওদিকে গায়ক শিলাজিত্‍ একটি রিল পোস্ট করেছেন, তাতে দেখা গেল, গেরুয়া রঙের জামা।  

Advertisement

বুদ্ধিজীবীদের কী খবর?

বুদ্ধিজীবী নাম শব্দবন্ধটিই বড় গোলমেলে। কীভাবে জীবিকা অর্জন করেন এঁরা, এই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তাই সুশীল সমাজ বলে আপাতত বোঝা নামানো যাক। ২০১১ সালের পরিবর্তনের অন্যতম মুখ বাংলার কিছু বুদ্ধিজীবী। আবার পরেও অনেক কবি, সাহিত্যিক বাম ছেড়ে জোড়াফুলে গিয়েছিলেন দল বেঁধে। এই সব বুদ্ধিজীবীর মধ্যে অন্যতম হলেন কবীর সুমন। বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী। bangla.aajtak.in-কে কবীর সুমন বলেছেন, 'আমার নিজের অনুভব, আমি তো তৃণমূলের মেম্বার নই, আমি তৃণমূলপন্থীও নই। আমায় মমতা প্রায় হাতেপায়ে ধরে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর আগে আমি কোনও পার্টির মেম্বার ছিলাম না। আমার ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্র আমি পদত্যাগ করি।' এই প্রতিবেদন লেখার সময় কবি সুবোধ সরকার, চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন, জয় গোস্বামী,  ফোনে ধরার চেষ্টা করা হল। তাঁদের ফোন বন্ধ। 

সাংবাদিক মহলে কী চলছে?

কলকাতা ও গোটা পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়া মহলেও বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাংবাদিকদের একাংশের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠছিল। রাজনৈতিক পালাবদলের পর এখন কিছু সাংবাদিক প্রকাশ্যে সেই অভিযোগগুলির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। একাংশ সাংবাদিক ইতিমধ্যেই নতুন সরকার গঠনের আগেই তদন্তের দাবি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হলে মিডিয়া মহলের ভেতরের আর্থিক লেনদেন ও প্রভাবের সম্পর্কগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। নতুন সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে, কলকাতার সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাঁদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের আয়, ব্যয়, সম্পত্তি এবং ভ্রমণ সংক্রান্ত সমস্ত তথ্যের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক। এই দাবিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কারণ অনেকেই মনে করছেন, এতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নও জড়িত।

এবারের বিধানসভা নির্বাচনে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবির মিলিয়ে প্রায় পাঁচজন বর্তমান বা প্রাক্তন সাংবাদিক নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করেছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নির্বাচনে সফলও হয়েছেন। অন্যদিকে, যারা এতদিন প্রকাশ্যে সরকারের পক্ষ নিয়ে অবস্থান করতেন, তাঁদের অনেককেই এখন অবস্থান বদলাতে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতাসীনদের কঠিন প্রশ্ন না করা যে সাংবাদিকরা, তাঁরাই এখন নিজেদের শো ও লেখালেখিতে সরব হয়ে উঠেছেন। অনেকেই তাঁদের অনুষ্ঠানগুলির ধরন পাল্টে ফেলেছেন, প্রশ্ন করার ভঙ্গি বদলেছে, আলোচনার বিষয়বস্তু বদলেছে। এমনকি পোশাকের রং থেকে শুরু করে অতিথি প্যানেল নির্বাচন, সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট।

এই দ্রুত রূপান্তরকে অনেকেই শুধুমাত্র পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বলেই দেখছেন না, বরং একে একটি বড় ধরনের ভাবাদর্শগত পরিবর্তন হিসেবেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব যে শুধু প্রশাসন বা দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে মিডিয়ার অন্দরমহলেও।

গ্রাফিক্স: কিশোর শীল

Read more!
Advertisement
Advertisement