
দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতিতে বরাবরই শেষ কথা বলে এসেছে জনতার আবেগের হাওয়া। কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পাহাড়ের তিন কেন্দ্র, দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কার্শিয়াঙে জয়ের গেরুয়া আবির উড়লেও সেই জয় সহজ হয়নি। যদিও জেলার সমতলে পদ্মশিবির একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে, তবে পাহাড়ে কিন্তু বিজেপির জয় মোটেও মসৃণ ছিল না। বরং এবারে পাহাড় সাক্ষী থাকল এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের, যেখানে প্রথাগত শক্তির পাশ কাটিয়ে এক নতুন ‘তৃতীয় শক্তি’র উত্থান প্রমাদ গুনছে বড় দলগুলোকে।
ত্রিমুখী লড়াই ও অজয় ফ্যাক্টর
পাহাড়ে এবার জিটিএ প্রধান অনিত থাপার নেতৃত্বাধীন বিজিপিএম যেমন বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ময়দানে ছিল, ঠিক তেমনই লড়াইয়ে চোরাস্রোত হয়ে দেখা দিয়েছিলেন অজয় এডওয়ার্ড। নিজের দলের পতাকা বা নির্দিষ্ট লোগো ছাড়াই, স্রেফ নির্দল প্রার্থীদের ছাতা হয়ে অজয় যা লড়াই দিয়েছেন, তা পাহাড়ের তথাকথিত ‘একচ্ছত্র’ রাজনীতির দিন শেষ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, সুবাস ঘিসিং বা বিমল গুরুংদের পর পাহাড়ের মুকুটহীন সম্রাট হওয়ার দৌড়ে অজয় এডওয়ার্ড অনেকটাই এগিয়ে গেলেন।
দার্জিলিঙে টক্কর সমানে সমানে
সবচেয়ে হাই-ভোল্টেজ লড়াই ছিল দার্জিলিং সদর আসনে। এখানে বিজেপির নোমান রাই ৬২ হাজার ০৭৬ ভোট পেয়ে জয়ী হলেও, তাঁর ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলেছেন বিজিপিএম-এর বিজয় কুমার রাই (৫৬ হাজার ১৯ ভোট)। তবে আসল চমক অজয় এডওয়ার্ডের নিজের পারফরম্যান্স। নির্দল প্রার্থী হিসেবে তিনি একাই টেনে নিয়েছেন ৪৮ হাজার ৬৩৫টি ভোট। ব্যবধান সামান্য হলেও এই লড়াই প্রমাণ করল, পাহাড় এখন আর কোনো একটি দলের ব্যক্তিগত জমি নয়।
কালিম্পং ও কার্শিয়াঙে ব্যবধান ও দাপট
কালিম্পং কেন্দ্রে ভরত ছেত্রী ৮৪ হাজার ২৯০ ভোট পেয়ে বিজেপির ঝান্ডা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। সেখানে বিজিপিএম-এর রুদেন সাদা লেপচা পেয়েছেন ৬২ হাজার ৮২৬ ভোট। তৃতীয় স্থানে থাকা ভেরন বৃত্ত লেপচার ঝুলিতে এসেছে ১৪ হাজার ২৩১ ভোট। অন্যদিকে, কার্শিয়াঙে বিজেপির সোনম লামা ৭৪ হাজার ৮৭৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেখানেও কড়া টক্কর দিয়েছে বিজিপিএম-এর অমর লামা (৫৭ হাজার ৮৭১ ভোট)। এখানেও ‘অজয় ফ্যাক্টর’ কাজ করেছে; নির্দল প্রার্থী বন্দনা রাই ৪১ হাজার ০৮৮ ভোট পেয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছেন।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ে বিজেপি সবকটি আসন জিতলেও বিজিপিএম দ্বিতীয় স্থানে থেকে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেই অজয় এডওয়ার্ডের ‘যুক্তফ্রন্ট’, যারা ভবিষ্যতে পাহাড়ের রাজনীতির ভরকেন্দ্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।