
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মসজিদে হামলা করা হচ্ছে, এই দাবিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। কোনও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে নামাজ পাঠরত এক ব্যক্তির পিছনে দাঁড়িয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে। কোথাও আবার মসজিদে ভাঙচুর করতে দেখা যাচ্ছে।
প্রত্যেকটি ভিডিও পোস্ট করেই দাবি করা হচ্ছে যে বিধানসভা ভোট পরবর্তী সময়ে মসজিদগুলো উপর এই ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। তবে আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে এই ভিডিওগুলির সঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী সংঘাতের কোনও সম্পর্ক নেই।
এই ভিডিওতে কোনও এক ব্যক্তিকে একটি মসজিদের ভেতরে নামাজপাঠ করতে দেখা যাচ্ছে। সেই সময়ে ওই ব্যক্তির পিছনে দাঁড়িয়ে কয়েকজনকে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে দেখা যাচ্ছে। যা স্পষ্টত নামাজপাঠে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “মসজিদে ট্রাম্পেট বাজিয়ে নামাজে ব্যা'ঘা'ত ঘটাচ্ছে ভারতীয় উ/গ্র হিন্দুত্ববাদীরা।”
তবে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে ভাইরাল ভিডিওটি ভারতের নয়, এমনকি সাম্প্রতিক সময়কারও নয়। এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একটি দরবার শরিফের ভিডিও।
ভাইরাল ভিডিওটি রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই একই ভিডিও ‘গশ্চি শাহী দরবার শরীফ’ নামের টিকটক হ্যান্ডেলে আসল ভিডিওটি পাওয়া যায়। ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “অসাধারণ বাজনা অসাধারণ বাশীর সুর #গশ্চি_শাহী_দরবার_শরীফ💖🙏💖 @আশেকানে আল মতিয়া আধুনিক ব্যান্ড পার্টি।”
ওই টিকটিক হ্যান্ডেলে, এবং ‘গশ্চি শাহী দরবার শরীফ’ নামের ইউটিউব চ্যানেলেও একই ধরনের ব্যান্ড পার্টির বাজনার একাধিক ভিডিও পাওয়া যায়। যেখানে একই ব্যক্তিদের একই ধরনের বাজনা বাজাতে দেখানে যায়। বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা রিউমর স্ক্যানারের পক্ষ থেকেও এই ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করা হয়। সেখানেও জানানো হয় যে ভিডিওটি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি দরবার শরিফের দৃশ্য।
এই ভিডিওটি একটি মসজিদের উপর উঠে জনাকয়েক ব্যক্তিকে শাবল, হাতুড়ি ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে কাঠামোটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে দেখা যাচ্ছে। এই ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “পশ্চিম'বঙ্গের বর্ত'মান চিত্র কো'থায় মান'বাধিকার? মসজি'দ ভাঙ্গচুর।”
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ঘটনাটি ভারতের নয় বরং পাকিস্তানের। সেখানে আহমদীয়া সম্প্রদায়ের একটি উপাসনালয় ভাঙচুর করা হয়।
রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে খোঁজা হলে ওই একই ভিডিও হিন্দুস্তান টাইমস-এর ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আপলোড হওয়া একটি ভিডিও পাওয়া যায়। এই ভিডিওকে ওই ব্যক্তিদের একই কাঠামোতে ভাঙচুর করতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি থেকে জানা যায়, এটি পাকিস্তানের করাচির জামশেদ রোডে অবস্থিত আহমদীয়া সম্প্রদায়ের একটি উপাসনালয় ভাঙচুরের দৃশ্য।
এ ছাড়াও পাকিস্তানি সংবাদ মাধ্যম ডন এবং দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন-এ এই বিষয়ক বিস্তারিত রিপোর্ট পাওয়া যায়। যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় এই ঘটনার সঙ্গে ভারতে মসজিদ ভাঙচুর করা কোনও সম্পর্ক নেই।
এই ভিডিওতে তুরা জামা মসজিদ লেখা একটি স্থানে কয়েকজনকে ভাঙচুর চালাতে এবং বিশৃঙ্খলা করতে দেখা যাচ্ছে। গত ৮ মে এ ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, মেঘালয়ে জামা মসজিদে হামলা-ভাঙচুর, মুসল্লিদের মারধরের অভিযোগ।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এটিও সাম্প্রতিক কোনও ঘটনার ভিডিও নয়। বরং গত মার্চ মাসে মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে স্থানীয় নির্বাচনের সময়কার। দ্য অবসার্ভার এবং দ্য হিন্দুস্তান গেজেটে প্রকাশিত এই একই ঘটনার ভিডিও থেকে জানা যায়, মেঘালয়ের তুরায় স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হিংসা ছড়ায়। সেই সময় বিশৃঙ্খল জনতা তুরার জামা মসজিদে ভাঙচুর চালায় এবং মসজিদের ইমামকে মারধর করে।
সবমিলিয়ে পরিষ্কার হয়ে যায় যে অসম্পর্কিত কিছু ভিডিও ছড়িয়ে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা পরবর্তী পরিস্থিতি বলে দাবি করা হচ্ছে, যা আসলে অসত্য।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের পর মসজিদে হামলা, ভাঙচুর এবং নামাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। ভাইরাল ভিডিওগুলো সেই ঘটনারই দৃশ্য।
ভাইরাল ভিডিওগুলোর কোনওটিই পশ্চিমবঙ্গের ভোট-পরবর্তী ঘটনার নয়। প্রথম ভিডিওটি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একটি দরবার শরিফের, দ্বিতীয়টি পাকিস্তানে আহমদীয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ভাঙচুরের এবং তৃতীয়টি মেঘালয়ের তুরায় স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে হওয়া হিংসার পুরনো ভিডিও।