
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগে বিজেপি যে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল অন্নপূর্ণা যোজনা। তৃণমূল সরকারের আমলে যে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে সরকারি আর্থিক সাহায্য পাঠনো হতো, সেই প্রকল্পকেই অন্নপূর্ণা যোজনা নামে মাসে ৩০০০ টাকা আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। যা নিয়ে বর্তমানে রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম।
এই আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে অন্নপূর্ণা ভান্ডার বা যোজনার জন্য নাম নথিবদ্ধ করার বা রেজিস্ট্রেশনের দাবিতেও একাধিক ওয়েবসাইটের লিঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিছু কিছু লিঙ্ক ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে যে এক মাধ্যমে অন্নপূর্ণা যোজনা বা অন্নপূর্ণা ভান্ডার প্রকল্পে নাম নথিবদ্ধ বা রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। কিছু লিঙ্ক ছড়িয়ে আবার বলা হচ্ছে যে এর মাধ্যমে লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে অন্নপূর্ণা প্রকল্পে নাম স্থানান্তরিত করতে হবে।
কিছু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এমন দাবিতেও ছড়িয়েছে যেখানে বলা হচ্ছে যে, ১ জুন থেকে নাকি অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাওয়া যাবে না। কারণ রাজ্যের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নাকি বলেছেন যে পোর্টাল এখনও তৈরি হয়নি। এবং টাকা পেতে আরও দু-তিন মাস লেগে যেতে পারে।
আজতক ফ্য়াক্ট চেকের এই প্রতিবেদনে আমরা একনজরে দেখে নেব অন্নপূর্ণা যোজনার নামে কী ধরনের ভুয়ো ওয়েবসাইট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁদ পেতেছে। সেই সঙ্গে এই যোজনার টাকা পাওয়া নিয়ে সরকার কী জানিয়েছে, সেটাও দেব নেব।
ভুয়ো ওয়েবসাইটের ছড়াছড়ি
অন্নপূর্ণা যোজনায় নাম নথিভুক্ত করানোর উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই অনেকে গুগলে এই ফর্ম সার্চ করতে শুরু করেছেন। আর গুগলে এই সার্চের ফলে যে সকল ওয়েবসাইটের লিঙ্ক সামনে আসছে, তার বেশিরভাগই ভুয়ো।
উদাহরণস্বরূপ, সার্চের ফলে যে ওয়েবসাইটগুলি সামনে আসছে তার মধ্যে কয়েকটি হলো — annapurnabhandar.wbicds.in , annapurnabhandarwb.in , annapurnabhandarwb.com . তবে এই ওয়েবসাইটগুলির একটিও সরকারি কোনও প্রকল্পের ওয়েবসাইট নয়। সাধারণত কোনও সরকারি প্রকল্প বা সরকারি কাজের জন্য যে ওয়েবসাইট ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাদের একটি নির্দিষ্ট ডোমেইন এক্সটেনশন থাকে যা ওয়েবসাইট অ্যাড্রেসের শেষের অংশে দেখা যায়। যেমন gov.in (Government & India) ডোমেইন ভারতের সরকারি ওয়েবসাইট নির্দেশ করে। কিছু কিছু সরকারি ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে nic.in ডোমেইনও ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনও ওয়েবসাইটেই সরকারি ডোমেইন এক্সটেনশন ব্যবহার করা হয়নি। যা থেকে কার্যত বুঝতে বাকি থাকে না যে ওয়েবসাইটগুলি আসলে ভুয়ো। ডোমেইন এক্সটেশন চেক করার নানা ধরনের টুলের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা যায় যে এই ডোমেইনগুলি মে মাসেই নানা ব্যক্তিগত স্তরে উদ্যোগে চালু করা হয়েছিল। এর সঙ্গে কোনও সরকারি যোগ নেই।
সেই সঙ্গে গত ১৯ মে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অন্নপূর্ণা যোজনা সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। যেখানে বলা হয়, আগামী ১ জুন, ২০২৬ থেকে অন্নপূর্ণা যোজনার পোর্টাল লঞ্চ করা হবে। অর্থাৎ, সেই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী মে মাসের মধ্যে এই ওয়েবসাইট চালু হওয়ার কথা নয়।
কারা পাবেন? কীভাবে পাবেন?
এই বিষয়ে একাধিক বিভ্রান্তির উদ্রেক হওয়ায় গত ২৩ মে নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বেশ কিছু বিষয় স্পষ্ট করেন। তিনি জানান যে যারা লক্ষ্মীর ভান্ডার এতদিন পেয়ে এসেছেন, তাঁদের নাম নিজের থেকেই অন্নপূর্ণা যোজনায় স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতাও নাগরিকত্বের আবেদন জানিয়েছেন, বা ভোটার তালিকায় নাম না থাকার কারণে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন, তাঁরাও এই টাকা পাবেন। তবে যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে ডিলিট হয়ে গিয়েছে তাঁরা এই টাকা পাবেন না। সেই সঙ্গে তিনি আরও জানান যে, যারা লক্ষ্মীর ভান্ডারে টাকা পেয়ে এসেছেন তাঁদের কোনও ধরনের ফর্ম ভরতে হবে না।
তবে যাঁরা এতদিন লক্ষ্মীর ভান্ডার পাননি, তাঁদের জন্য একটি নতুন পোর্টাল তৈরি করা হচ্ছে, জানান অগ্নিমিত্রা। এখনও তা তৈরি না হলেও নানা মাধ্যমে ভুয়ো পোর্টাল ঘুরছে, সতর্ক করেন তিনি। একবার এই পোর্টাল তৈরি হলে গেলে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে অগ্নিমিত্রা জানিয়েছেন। তখন নতুন আবেদনকারীরা সেখানে আবেদন করতে পারবেন। রাজ্যের বাজেট হয়ে যাওয়ার পর নতুন আবেদনকারীরা টাকা পেয়ে যাবেন বলে তিনি আশ্বাস দেন। তবে রাজ্যে অন্নপূর্ণা যোজনা যে ১ জুন থেকেই চালু হয়ে যাচ্ছে, সে কথা আগেই জানিয়েছে সরকার।
এরপর মঙ্গলবার, অর্থাৎ ২৬ মে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক সাংবাদ বৈঠকের মাধ্যমে জানান যে, বুধবার অর্থাৎ ২৭ মে থেকেই এই প্রকল্পের আবেদনপত্র প্রকাশ করা হবে এবং আবেদন অফলাইন ও অনলাইন— দুই মাধ্যমেই করা যাবে। তিনি আরও দাবি করেছেন, নতুন প্রকল্পে মহিলাদের মাসিক ৩০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। তবে নতুন প্রকল্পের টাকা দেওয়া শুরু না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান “লক্ষ্মীর ভান্ডার”-এর টাকা আগের নিয়মেই চালু থাকবে।
বর্তমানে যারা “লক্ষ্মীর ভান্ডার”-এর সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁদের অনেককেই সরাসরি “অন্নপূর্ণা যোজনা”-য় স্থানান্তর করা হতে পারে। প্রশাসনের তরফে বিডিও অফিসের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম পূরণে সাহায্য করার কথাও জানানো হয়েছে। যোগ্যতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ২৫ থেকে ৬০ বছরের সেই সমস্ত মহিলারা আবেদন করতে পারবেন, যারা আয়কর দেন না এবং স্থায়ী সরকারি চাকরিতে নেই। পাশাপাশি আধার-সংযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক করা হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।