
মনের মতো বাড়ি অথবা বিল্ডিংয়ের ডিজাইন তৈরি করতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বা আর্কিটেকদের সাহায্য নিয়ে থাকেন অনেকেই। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা কিংবা মালয়েশিয়ার ওয়ারিসন মার্ডেকা টাওয়ার। বিভিন্ন সময় এমনই সব অবিশ্বাস্য সব ডিজাইন বানিয়ে মানুষকে তাক লাগিয়ে দেন তাঁরা।
তবে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি বিল্ডিংয়ের ছবি খুবই ভাইরাল হয়েছে। ছবিটি দেখে মনে হবে বিল্ডিংটি গলে পড়ছে বা ক্যামেরার কোনও ফিল্টারের সাহায্যে সেটি তোলা হয়েছে। তবে ছবিটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, প্যারিসে অবস্থিত এই বিল্ডিংটি এমনভাবেই ডিজাইন করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, এক ফেসবুক ব্যবহারকারী ভাইরাল বিল্ডিংয়ের ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, “প্যারিসের এই বিল্ডিংটি এভাবেই ডিজাইন করা।” (ক্যাপশনের সব বানান অপরিবর্তিত।) একই দাবি-সহ আরও পোস্ট দেখতে এখানে ক্লিক করুন। এমনই একটি পোস্টের আর্কাইভ এখানে দেখা যাবে।
ইন্ডিয়া টুডে ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ছবিতে যে ডিজাইন দেখা যাচ্ছে সেটি আসল নয়। বরং সেটি প্যারিসের পঞ্চম জর্জ অ্যাভিনিউতে অবস্থিত একটি বিল্ডিংয়ের সামনের অংশে লাগানো ক্যানভাস বা কভার।
কীভাবে জানা গেল সত্য?
ভাইরাল ছবিটির সত্যতা জানতে আমরা সেটিকে নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করি। তখন আমরা Art Wanted নামক একটি ওয়েবসাইটে ভাইরাল বিল্ডিংটির একই রকম একটি ছবি দেখতে পাই এবং ছবিটি ২০০৭ সালের ৯ অক্টোবর তোলা হয়েছিল বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়। সেখানে ছবিটি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, বিল্ডিংটি প্যারিসের পঞ্চম জর্জ অ্যাভিনিউয়ের চ্যাম্পস এলিসিস সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত। ২০০৭ সালে এই বিল্ডিংটি ব্লেকার নামক একটি সংস্থার সদর দপ্তর ছিল। সেই সময় বিল্ডিংটি সংস্কারের জন্য ব্লেকার গ্রুপ সোসাইটি অ্যান্থেমকে বিল্ডিংয়ের জন্য একটি কভার বানানোর নির্দেশ দেয়।
তখন শিল্পী পিয়েরে ডেলাভি তাঁর ৪০ জন সহকর্মীকে নিয়ে এই অবিশ্বাস্য কভারটি তৈরি করেছিলেন। এই কাজের জন্য পিয়েরে ডেলাভি প্রথমে বিল্ডিংটির সামনেরদিকের অংশের একটি ছবি তোলেন। পরে সেই ছবিকে নিজের শিল্পকলার মাধ্যমে ভাইরাল কভারটি তৈরি করেন এবং সেটিকে একটি ২৫০০ বর্গ মিটারের বিশাল ক্যানভাস শীটে মুদ্রণ করেন। এরপর সেই কভারটি দিয়ে বিল্ডিংটির সামনের অংশ ঢাকা হয়। যেটি দেখে বিল্ডিংয়ের আসল ডিজাইন মনে হয়।
এরপর আমরা উপরে প্রাপ্ত তথ্যের উপরে ভিত্তি করে এই সংক্রান্ত একধিক কিওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে এই বিল্ডিং সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করি। তখন আমরা ‘দ্য মাইন্ড সার্কেল’ নামের একটি ওয়েবসাইটে ভাইরাল বিল্ডিংটির আরও একাধিক ছবি খুঁজে পাই। ছবিগুলি পোস্ট করে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, প্যারিসের পঞ্চম জর্জ অ্যাভিনিউতে অবস্থিত এই বিল্ডিংটি ‘মেল্টিং বিল্ডিং’ নামেও পরিচিত। ২০০৭ সালে বিল্ডিংটি সংস্কারের উদ্দেশ্যে কর্তৃপক্ষ এর একটি কভার বা ম্যুরাল তৈরির নির্দেশ দেয়। ম্যুরালটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে দৃষ্টিভ্রম তৈরি হয়। দেখে মনে হয় যেন, ভবনটি ঘন তরলের মতো গলে পড়ছে।
পিয়েরে ডেলাভি নামক এক শিল্পী ভবনটির মূল কাঠামোর আদলে ম্যুরালটি তৈরি করেন এবং এটি পরে কম্পিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে বড় ক্যানভাসে ছাপা হয়। সংস্কারকাজের সময় ক্যানভাসটি ভবনের সম্মুখভাগে রাখা হয়, এতে পুরো ভবন আড়াল হয়ে যায়। পিয়েরে ডেলাভি ছবিগুলো এমনভাবে তৈরি করেছিলেন যে, দেখে মনে হয় যেন এটিই ভবনের মূল আকৃতি।
এরপর আমরা উপরে প্রাপ্ত তথ্যকে সূত্র হিসাবে ধরে গুগুল ম্যাপে মূল বিল্ডিংটি খুঁজে বের করি। গুগুল ম্যাপে আমরা বিল্ডিংটির যে ছবিটি পাই তার সঙ্গে ভাইরাল ছবিটিকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করি। তখন আমরা উভয় ছবির ছাদ, জানালা ও রেলিংয়ের হুবহু মিল দেখতে পাই। এ ছাড়াও বিল্ডিংটির সামনের রাস্তা, গাছ, পতাকার স্ট্যান্ড, আশপাশের অন্য বিল্ডিংগুলোরও মিল পাওয়া যায়। তবে গুগুল ম্যাপে বিল্ডিংটির যে ছবি আমরা পাই তা অন্যান্য মতোই স্বাভাবিক। ভাইরাল ছবির মতো বিল্ডিংটি গলে বা ভেঙে পড়ছে মনে হচ্ছে না!
এর থেকে প্রমাণ হয়, প্যারিসে অবস্থিত বিল্ডিংয়ের ডিজাইন দাবি করে যে ছবিটি ভাইরাল করা হচ্ছে সেটি আসল ডিজাইন নয়। বরং ভাইরাল ছবিটি আসল বিল্ডিংয়ের সামনের অংশে লাগানো ক্যানভাস বা কভার।
ছবিতে প্যারিসে অবস্থিত একটি বিল্ডিংয়ের ডিজাইন দেখা যাচ্ছে।
প্যারিসে অবস্থিত বিল্ডিংয়ের ডিজাইন দাবি করে যে ছবিটি ভাইরাল করা হচ্ছে সেটি আসল ডিজাইন নয়। বরং ভাইরাল ছবিটি মূল বিল্ডিংয়ের সামনের অংশে লাগানো ক্যানভাস বা কভার।