
পালা বদলের বাংলায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পরেই স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মানুষের সমস্যা করে রাস্তা আটকে কোনও ধর্মীয় সমাবেশ হবে না। আর মুখ্যমন্ত্রীর সেই মন্তব্যের পরেই দীর্ঘ দিনের প্রথা ভেঙে কলকাতার রেড রোডের পরিবর্তে এবছরের ইদের নমাজ হয় ব্রিগেড ময়দানে। আর এই সার্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে, শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী বিক্ষোভ এবং ইদের নামজ সংক্রান্ত দুটি তথাকথিত ভিডিও।
যেখানে প্রথম ভিডিওতে পাজামা-পাঞ্জাবি এবং ফেজ টুপি পরিহিত বহুসংখ্যক মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে রাস্তা দিতে ছুটে যেতে এবং একটি বিল্ডিং লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পদত্যাগের দাবিতে মুসলিমদের বিক্ষোভের দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল প্রখম ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ভারতে শুভেন্দুর পদ ত্যাগের দাবিতে রাজপথে মুসলমানরা।”
অন্যদিকে দ্বিতীয় ভিডিওতে কোনও একটি মাঠের মধ্যে বেশকিছু ব্যক্তিকে লাঠি হাতে মারধর করতে এবং অপর পক্ষকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, সেটি ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা ইদের নামাজ পড়তে বাধা দেওয়ায় মুসলিমদের বিক্ষোভের দৃশ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল দ্বিতীয় ক্লিপটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ভারতে ঈদের নামাজ পড়তে বাধা দিলে কড়া জবাব মুসলিমদের।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিও ক্লিপ দুটির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের কোনও সম্পর্ক নেই। বরং প্রথম ক্লিপটি ২০২৫ সালের ২৮ অগস্ট বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার কাঞ্চনঘাটে 'জীবন মহল' নামক একটি রিসোর্টে ক্ষুব্ধ জনতার হামলার দৃশ্য। অন্যদিকে দ্বিতীয় ক্লিপটি ২০২৫ সালের ১০ জুন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে চাষের জমি থেকে শসা খাওয়াকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের দৃশ্য।
সত্য উন্মোচন
প্রথম ভিডিও: ভাইরাল প্রথম ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৫ সালের ২৯ অগস্ট বাংলাদেশ ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম City News Dhaka-র ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও পাওয়া যায়। যে ভিডিও-র ১৩ সেকেন্ডের ফ্রেমের সঙ্গে ভাইরাল প্রথম ভিডিও-র ১১ সেকেন্ডের ফ্রেমের হুবহু মিল পাওয়া যায়। ভিডিওটি শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “দিনাজপুর জীবন মহল পার্কে কর্মচারী ও স্থানীয় তাওহীদ জনতার মধ্যে সংঘাত; সেনাবাহিনী ও পুলিশ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে পরিস্থিতি।”
এরপর উক্ত সূত্র ধরে এই সংক্রান্ত পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে একাধিক বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই সব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৮ অগস্ট বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার কাঞ্চনঘাটে অবস্থিত 'জীবন মহল' নামক একটি রিসোর্ট তথা পার্কে হামলা চালায় ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে কয়েকশো মানুষ। মূলত,ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তুলে এই হামলা চালানো হয়। তবে ভাইরাল ভিডিওটি 'জীবন মহলে হামলার দৃশ্য কিনা সে বিষয়ে একশো শতাংশ নিশ্চিত হতে এরপর আমরা গুগল ম্যাপেও বাংলাদেশের দিনাজপুরের কাঞ্চনঘাটে অবস্থিত 'জীবন মহল' রিসোর্টটি খুঁজে বার করি। গুগল ম্যাপে ওই রিসোর্ট থেকে মাত্র একশো মিটার দূরের দৃশ্যের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওতে থাকা স্থানের হুবহু মিল পাওয়া যায়। নীচে গুগল ম্যাপটি দেখা যাবে।
দ্বিতীয় ভিডিও: ভাইরাল দ্বিতীয় ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক স্ক্রিনশট নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৫ সালের ১০ জুন ভাইরাল ভিডিও-র একাধিক স্ক্রিনশট-সহ একাধিক বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেইসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভাইরাল দ্বিতীয় ভিডিওটি আসলে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের দৃশ্য। মূলত, নাসিরনগরের সুহেল মিয়ার চাষের জমি থেকে শসা চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে স্থানীয় বাসিন্দা জালাল মিয়ার ছেলে হৃদয় মিয়া। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিবাদে এবং পরবর্তী মারধরে জড়িয়ে পড়ে উভয় পরিবারের সদস্যরা।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে, ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গে হিংসা এবং অস্থিরতার ঘটনা দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে বাংলাদেশের সব ভিডিও।
প্রথম ভিডিওতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পদত্যাগের দাবিতে এবং দ্বিতীয় ভিডিওতে ভারতে ইদের নামাজ পড়তে বাধা দেওয়ায় মুসলিমদের বিক্ষোভের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
ভাইরাল ভিডিও ক্লিপ দুটির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ভারতের কোনও সম্পর্ক নেই। বরং প্রথম ক্লিপই বাংলাদেশের দিনাজপুরের একটি রিসোর্টে হামলার দৃশ্য। অন্যদিকে দ্বিতীয় ক্লিপটি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের দৃশ্য।