
বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর থেকেই বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একাধিক রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে শনিবার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণের পরই হিংসামুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী -সহ বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। আর এই সার্বিক পরিস্থিতির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়েছে।
যেখানে বেশ কয়েকজনকে ব্যক্তিকে খালি গায়ে থাকা এক যুবককে বেধড়ক মারধর করতে এবং তার গায়ে কালি ঢেলে দিতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি, তাদের মধ্যে গলায় গেরুয়া গামছা পরিহিত কয়েকজন আক্রান্ত ওই যুবককে জোরপূর্বক ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বলছে। ভিডিওটি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভের পর পশ্চিমবঙ্গে এক মুসলিম যুবককে বেধড়ক মারধর করার পাশাপাশি তাকে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করেছে বিজেপি কর্মীরা।
উদাহরণস্বরূপ, ভাইরাল ভিডিওটি শেয়ার করে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেখানকার মুসলমানদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে মুরব্বি থেকে জোয়ান যত মুসলমান আছেন সবাইকে ধরে ধরে জয় শ্রীরাম বাড়াচ্ছে এই কুলাঙ্গার হিন্দু সন্ত্রাসীরা ।”
আজতক ফ্যাক্ট চেক অনুসন্ধান করে দেখেছে যে, ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ভোট পরবর্তী হিংসার কোনও সম্পর্ক নেই। বরং সেটি লাভ জিহাদের অভিযোগে ২০২৬ সালের ১০ মে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যদের তরফে মধ্য প্রদেশের রাজধানী ভোপালে এক মুসলিম যুবককে মারধরের দৃশ্য।
সত্য উন্মোচন
ভাইরাল ভিডিও এবং দাবির সত্যতা জানতে সেটি থেকে একাধিক কি-ফ্রেম সংগ্রহ করে সেগুলিকে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। তখন ২০২৬ সালের ১১ মে একটি এক্স হ্যান্ডেলে এই একই ভিডিও-সহ একটি পোস্ট পাওয়া যায়। সেই পোস্টের ক্যাপশনে ভিডিওটিকে মধ্য প্রদেশের রাজধানী ভোপালের ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে বজরং দলের সদস্যরা ভোপালের একটি হোটেল থেকে একজন মুসলিম যুবককে এক হিন্দু যুবতীর সঙ্গে আটক করে। এবং লাভ জিহাদের অভিযোগে তারা ওই যুবককে মারধর।
এরপর এই সংক্রান্ত পরবর্তী অনুসন্ধান চালালে ২০২৬ সালের ১২ মে এই একই ভিডিও-র স্ক্রিনশট-সহ এনডিটিভির একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চলতি বছরের ১০ মে রবিবার মধ্য প্রদেশের জাহাঙ্গীরাবাদের বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী আরিফ খান একান্ত সময় কাটানোর জন্য তার সঙ্গীকে নিয়ে ভোপালের একটি হোটেলে ওঠে। সেই খবর কোনও ভাবে স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা জানতে পারে। এরপরেই তারা ওই হোটেলে পৌঁছে যায়। এক পর্যয়ে তারা জোরপূর্বক হোটেল কক্ষে প্রবেশ করে আরিফ এবং তার হিন্দু সঙ্গীকে টেনে বের করে আনে।
পাশাপাশি, আরিফের বিরুদ্ধে লাভ জিহাদের অভিযোগ তুলে তাকে অর্ধনগ্ন করে জনসমক্ষে নির্মমভাবে মারধর করে এবং তার গায়ে কালি ও গোবর মাখিয়ে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তবে আরিফের সঙ্গী বারবার দাবি করেন যে তিনি গত পাঁচ বছর ধরে আরিফের সঙ্গে নিজের ইচ্ছাতেই লিভ-ইন সম্পর্কে রয়েছেন, কিন্তু হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যরা তার কোনও কথায় শোনেনি বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে ওই যুবতী থানায় গিয়ে পুলিশের সামনে তাদের সম্পর্কের কথা জানালে থানা থেকে আরিফের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ না দায়ের করেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে এখানে উল্লেখ্য, গত ৪ মে ভোটের ফলপ্রকাশ হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অশান্তির খবর সামনে এসেছে। কোথাও তৃণমূলের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়, তো কোথাও আবার তৃণমূল কর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। বেশিরভাগ অভিযোগের তীর বিজেপি কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে। তবে সেই সব ঘটনার সঙ্গে ভাইরাল ভিডিও-র কোনও সম্পর্ক নেই।
এর থেকে প্রমাণ হয় যে পশ্চিমবঙ্গের ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনা দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে মধ্যপ্রদেশের ভিডিও।
ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, বিধানসভা নির্বাচনে ফল ঘোষণা হতেই পশ্চিমবঙ্গে এক মুসলিম যুবককে বেধড়ক মারধর করার পাশাপাশি তাকে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করছে বিজেপি কর্মীরা।
ভাইরাল ভিডিওটির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ভোট পরবর্তী হিংসার কোনও সম্পর্ক নেই। বরং সেটি লাভ জিহাদের অভিযোগে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যদের তরফে মধ্যপ্রদেশের ভোপালে এক মুসলিম যুবককে মারধরের দৃশ্য।